সঞ্চয় ভেঙ্গে আর ধার করে চলছে মধ্যবিত্ত। এরপর?

1
173

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : করোন ভাইরাসের কারণে লকডাউনের প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের আয়েও পড়েছে। তারা এখন তাদের সঞ্চয় ভেঙ্গে খাচ্ছে। অনেককে ঋণও করতে হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে আর বড়জোর এক-দুই মাস চলা সম্ভব হবে। এরপর কী হবে তাদের?

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশে গত ২৬ মার্চ থেকে চলছে সাধারণ ছুটি, যে কারণে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত সব বন্ধ রয়েছে। একদিকে খেটে খাওয়া মানুষের রোজগারে টান পড়ছে, অন্যদিকে বাইরে বেরুলে সংক্রমণের ঝুঁকি, এ যেন উভয় সংকট! মধ্য আয়ের মানুষের রোজগারেও করোনাভাইরাসের ‘লকডাউনের’ প্রভাব পড়েছে।

এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন কাটছে কিংবা অর্ধেক বেতন দিচ্ছে, এমনকি বেতন দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠছে। যদিও সরকার বেশ কিছুদিন ধরেই কর্মীদের বেতন না কাটা এবং কর্মী ছাটাই না করার জন্য নিয়োগদাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের সাফ জবাব, তাদের সামর্থ নেই।

অনেক স্কুলের শিক্ষকই জানিয়েছেন যে অনলাইনে ক্লাস নেয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাদের পূর্ণ বেতন দেয়া হচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনলাইনে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে ঢাকার ধানমন্ডির একটি স্কুলে। সেই স্কুলের শিক্ষক সাঈদা খাতুন জানিয়েছেন, শুরু থেকেই অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন। তবুও বেতন অর্ধেক দেওয়া হচ্ছে। সাঈদা খাতুনের স্কুল বন্ধ ১৮ মার্চ থেকে। কিন্তু এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, যতদিন স্কুলের কার্যক্রম স্বাভাবিক না হবে ততদিন শিক্ষক ও অন্য কর্মীদের পুরো বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। স্কুলের সব শিক্ষক ও কর্মচারীর বেতন অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে।

সাঈদা খাতুন বলেন, “এখন আমাদের স্কুলে যেতে হয় না ঠিকই, কিন্তু সিলেবাস ধরে টপিক ম্যাটেরিয়াল বানানো ও অনলাইন লেকচার তৈরি করার কাজ নিয়মিত করছি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্ক দেওয়া এবং সেগুলো আবার মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানোর পর চেক করে ফিডব্যাকও দিচ্ছি আমরা নিয়মিত।”
কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলছে, লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যে স্বাভাবিক বেতন দেওয়ার ক্ষমতা নেই তাদের, কারণ শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসছে না, বেতন দিচ্ছে না।

সাঈদা খাতুন বলেন, ‘‘আবার আমি বাসায় বাচ্চাদের ব্যাচে পড়াতাম, মূলত ওই রোজগারটা দিয়েই আমার সংসারটা চলে। কিন্তু গত দেড় মাসের বেশি সময় ধরে সেটা বন্ধ। ফলে সংসার চালানোর জন্য আমাকে আমার সঞ্চয়ে হাত দিতে হয়েছে। জমানো টাকা দিয়েও বড়জোড় দুয়েক মাস চলা যাবে।’’

শিবলী নোমান একজন আইনজীবী। তিনি জানান, প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হবার পর থেকেই তার চেম্বারে মক্কেলদের আসা কিছুটা কমে যায়। এরপর সাধারণ ছুটিতে আদালত বন্ধ হলে তিনি নিজেও পুরান ঢাকার জজকোর্ট এলাকার নিজের চেম্বারে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

তিনি বলেন, “আদালত বন্ধ, মামলার কার্যক্রম বন্ধ, সুতরাং আমার তো ইনকাম বন্ধ। কিন্তু আমার সহকারী আছে, কেয়ারটেকার আছে। বিদ্যুত-পানির জন্য মাসে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়। অফিস ভাড়া দিতে হয়। অথচ আমার রোজগার বন্ধ। শেষ পর্যন্ত আমার সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। আর কিছুদিন এভাবে চললে আমাকে ঋণ করে চলতে হবে।”

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ উভয় সংকটে পড়েছে। স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে বাধ্য হচ্ছে অনেক মানুষ। এর মধ্যে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্তের বিপদ অনেক বড়, সংকটে এরা পথেও নামতে পারবে না আবার কারো কাছে হাতও পাততে পারবে না।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ে হাত পড়বে। তবে এখুনি সেটা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে কমই দেখা যাবে। কারণ, মানুষের সাধারণ প্রবনতা হিসেব করলে দেখা যাবে প্রথমদিকে নিজেদের হাতে থাকা সঞ্চিত অর্থ খরচ করবে তারা, এরপর দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ে হাত দেবে। সবশেষে কোনো বিনিয়োগ থাকলে সেটা খরচ করে ফেলবে। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে, আগামী দুয়েক মাসের মধ্যেই সেটা প্রবলভাবে দৃশ্যমান হবে।

বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউনের ফলে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ পরিবার ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়বে। সংস্থাটি বলছে, এই পরিস্থিতির কারণে দারিদ্র্য সীমার ঠিক ওপরে যারা আছেন, অর্থাৎ নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী, তারাও দারিদ্র্য সীমার মধ্যে পড়ে যাবে বর্তমান অবস্থার কারণে।

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, ব্যাংকে সঞ্চয় ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here