সমস্যা যখন মাথা ব্যথা

0
331
ছবি- প্রতীকী

ডা. স্নিগ্ধা সরকার

মাথা ব্যথায় ভোগেননি, এরকম মানুষ পাওয়া মনে হয় দুষ্কর। কম বেশি আমরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো সময় মাথা ব্যথায় ভুগেছি। কারণ ও উপসর্গ অনুযায়ী মাথা ব্যথা কয়েক রকম হতে পারে।

দুশ্চিন্তা জনিত মাথা ব্যথা:
মাথা ব্যথায় ভোগা সকল রোগীদের মধ্যে টেনশনজনিত মাথা ব্যথার রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৭০ শতাংশ)। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদ, কাজের অতিরিক্ত চাপ এই ধরনের মাথা ব্যথার কারণের সাথে সম্পর্কিত। এই ধরনের মাথাব্যথা দিনের শুরুতে কম থাকে এবং যতই সময় যায় ততই মাথা ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকে। সাধারণত মাথার চারপাশে চেপে ধরার মতো ব্যথা থাকে। কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক মাস পর্যন্ত এই ধরনের ব্যথা থাকতে পারে। নারীদের তুলনায় পুরুষেরা এই দুশ্চিন্তাজনিত মাথা ব্যথায় বেশি ভোগে।

মাথা ব্যথায় দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্বল্প মাত্রার অ্যামিট্রিপটাইলিন (Amitriptyline) জাতীয় ঔষধ ব্যবহারে সুফল পাওয়া যায়।
মাইগ্রেন:

পুরুষদের তুলনায় মধ্যবয়সী নারীদের এই ধরনের মাথা ব্যথা বেশি হয়ে থাকে। মাথার এক পাশে সাধারণত তীব্র ব্যথা হয়।এজন্য অনেকে একে এক কপালি মাথা ব্যথাও বলে। মাথা ব্যথার সাথে বমি হতে পারে বা বমি বমি ভাব থাকতে পারে। এই ব্যথা শুরু হলে সাধারণত ৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই রকম মাথা ব্যথা শুরু হবার পূর্বে কিছু বিশেষ উপসর্গ পরিলক্ষিত হয়। যেমন- চোখের সামনে তারার মতো আলোর ঝলকানি দেখা যায় বা রোগীর দৃষ্টি শক্তি ঝাপসা হতে পারে। এই ধরনের মাথা ব্যথার সময় আক্রান্ত ব্যক্তির উচ্চ শব্দ বা আলো অসহ্য বোধ হয়। তাই এই রকম মাথা ব্যথার সময় রোগী নিরিবিলি ও অন্ধকার ঘরে থাকতে পছন্দ করে।

অতিরিক্ত চা-কফি পান, চকোলেট খাওয়া, ঠিকমতো ঘুম না হওয়া, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, জন্মনিয়ন্ত্রণের পিল সেবন এই রকম মাথা ব্যথার জন্য অনেক সময় দায়ী হয়। তাই এসব এড়িয়ে চলতে হবে।

তীব্র মাথা ব্যথার সময় অর্থাৎ মাইগ্রেনের অ্যাটাক হবার সময় শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ খুব একটা ভালো কাজ করে না। সেক্ষেত্রে ব্যথানাশক ঔষধ যেমন- টলফেনামিক অ্যাসিড ((Tolfenamic acid) খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়। বমির জন্য ডমপেরিডন (Domperidone) জাতীয় ঔষধ সেবন করা যেতে পারে।

মাইগ্রেনের মাথা ব্যথার হার কমানোর জন্য বিভিন্ন ঔষধ রয়েছে। যেমন- প্রোপ্রানোলল (Propranolol), অ্যামিট্রিপটাইলিন (Amitriptyline), পিজোটিফেন (Pizotifen) ইত্যাদি। এসব এক বা একাধিক ঔষধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করা যেতে পারে।

এই ঔষধগুলো দীর্ঘমেয়াদী সেবন করলে মাইগ্রেনের ব্যথার হার অনেকাংশে কমে যায়। এসব ঔষধ অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে। কারণ, এসব ঔষধের অনেক রকম পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া আছে।

ক্লাস্টার ধরনের মাথা ব্যথা:
যদিও এধরনের মাথা ব্যথায় ভোগা রোগীর সংখ্যা কম। তবে ত্রিশোর্ধ পুরুষ, বিশেষ করে যারা ধূমপায়ী তাদের এই ধরনের মাথা ব্যথা হতে পারে। মাথার এক পাশে তীব্র ব্যথা হয়। এধরনের মাথা ব্যথার বৈশিষ্ট্য হলো সপ্তাহের একই সময়ে এই মাথা ব্যথা শুরু হয়। সাধারণত আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা সময় পর্যন্ত এই ব্যথা স্থায়ী হতে পারে। সাথে অন্যান্য কিছু উপসর্গ যেমন- চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক ও চোখ থেকে পানি পড়া ইত্যাদি থাকতে পারে।

মাথা ব্যথার অন্যান্য কারণ:
এছাড়াও অন্যান্য অনেক কারণে মাথা ব্যথা হতে পারে। যেমন: কানপাকা রোগ, দাঁতের সমস্যা, সাইনুসাইটিস ইত্যাদি। এছাড়া মস্তিষ্কের প্রদাহ অর্থাৎ মেনিন জাইটিস, এনকেফালাইটিস, মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক, মস্তিষ্কের টিউমার এসব কারণেও মাথা ব্যথা হতে পারে।
মাথা ব্যথার বিপদজনক লক্ষণসমূহ:
 হঠাৎ করে তীব্র মাথা ব্যথা শুরু হওয়া
 রোগীর বয়স যদি ৫৫ বছর বা তার বেশি হয়
 মাথা ব্যথার সাথে যদি বমি হয়
 সামনের দিকে ঝুঁকলে বা হাঁচি কাশির সাথে যদি মাথা ব্যথা তীব্র হয়
 মাথা ব্যথার সাথে যদি শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যায়, দৃষ্টি শক্তি কমে যায় বা রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়।
এসব উপসর্গ পরিলক্ষিত হলে দেরী না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

লেখক: এমডি রেসিডেন্ট (নিউরোলজি), ফেজ-বি, নিউরোলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here