সরকারি মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত বরিশাল কলেজ নামকরণ দাবী

0
323

আশ্বিনী কুমার দত্ত (১৮৫৬-১৯২৩) বরিশাল কালিবাড়ি রোডে নিজস্ব ভবনে বসবাস করতেন। ১৯২২-এর আগস্ট মাসে আশ্বিনী কুমার দত্ত অসুস্থ শরীর নিয়ে কলকাতা যান এবং ১৯২৩ সালের ৭ নভেম্বর ডাক্তার নীল রতন দে’র চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই মারা যান। অশ্বিনী ভবন ছিলো একটা বড়ো দোতলা বাড়ি যার উপরে চিলেকোঠা সংলগ্ন দুটি কক্ষ। দুইতলার প্রতি তলায় ছিল ছয়টি করে কক্ষ এবং একটি বড় হলঘর, সামনে পিছনে বারান্দা; পিছনের বারান্দার সঙ্গে রান্নাঘর, স্নানঘর।
বাড়ির প্রধান ফটকে ঢুকতে ডান দিকের স্তম্ভে ছোটো নাম ফলকে লেখা ছিলো ‘অশ্বিনী ভবন কালীবাড়ী রোড, বরিশাল’।
অশ্বিনী ভবন কেবল একটি বাসস্থান বা ভবনই নয়। বলা যায় বরিশালবাসীর ঐতিহ্যের প্রতীক এই অশ্বিনী ভবন, এই বাড়িতে এসেছেন মহাত্মা গান্ধি, ব্যারিস্টার আবদুল্লা রসুল আবদুল হাকিম গজনভী, সুরেন্দ্রনাথ ব্যনার্জি প্রমুখ। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পীঠস্থান হয়ে উঠেছিলো এই ভবন। এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বের কুচকাওয়াজ। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের নানা সমাবেশ অনুষ্ঠান।
অশ্বিনীকুমার দত্ত বরিশালের গৌরনদীর বাটাজোর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন সাব-জজ ব্রজমোহন দত্ত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ এ পাশ করেন ও ১৮৭৯ সালে এলাহাবাদ থেকে মাত্র ২৩ বছর বয়েসে আইন (বি.এল) পাশ করেন তিনি। ওই বছর তিনি শ্রীরামপুরের চাতরা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস অশ্বিনী কুমার দত্তকে খুবই স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। দেশবন্ধু অশ্বিনী দত্তকে বলেছিলেন “যদি নাম করতে চাও তাহলে কোলকাতায় থাকো, আর যদি কাজ করতে চাও তাহলে তুমি তোমার বরিশালে ফিরে যাও”। নাম নয়,কাজ করবেন বলেই সিন্ধান্ত নিয়ে অশ্বিনী কুমার দত্ত বরিশাল ফিরে এসেছিলেন। বরিশাল চলে আসার পর পিতা ব্রজমোহন দত্ত তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন” এতো পড়াশুনা করে তুমি কোলকাতা ছেড়ে বরিশাল চলে এলে কেন”?
অশ্বনী কুমার দত্ত দৃঢ়তার সংগে উত্তর দিয়েছিলেন- “বাবা আমি যেটুকু শিক্ষা গ্রহন করেছি সেটা আমি আমার দেশের জন্য, আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নয়ন, কুসংস্কার থেকে মুক্তির জন্য কাজে লাগাতে চাই।”
পুত্রের এমন অবাক করা দৃঢ়তা সংকল্পতায় গর্বিত পিতা ব্রজমোহন দত্তের পিতৃত্ব সেদিন সার্থক হয়েছিল নিশ্চয়ই। চোখের কোনে জমে ওঠা চিকচিক করা আবেগের জলে পুত্র অশ্বিনী কুমার দত্তের সংকল্পে সেদিন গর্বিত কন্ঠে পিতা পুত্রকে বলেছিলেন- “অশ্বিনী তোমার সংকল্পে তুমি সফল হলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হবো,গর্বিত হবো।”
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এই উপমহাদেশে বরিশালের অগ্রগামী ভূমিকার পেছনে নক্ষত্রের মত ভূমিকা রেখেছেন অশ্বিনী কুমার দত্ত। বৃটিশ আমলে বরিশালের শিক্ষা, রাজনীতি এবং জ্ঞান অন্বেষণে পুরোধাব্যক্তিত্ব ছিলের তিনি। আকর্ষণীয় আইন পেশা ছেড়ে মানুষের জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।
ক্স ১৮৮৪ সালে ব্রজমোহন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ক্স ১৮৮৬ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য ‘পিপলস্ অ্যাসোসিয়েশন’ স্থাপন করেন।
ক্স ১৮৮৭ সালে তার প্রচেষ্টায় বরিশাল ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড স্থাপিত হয়।
ক্স ১৮৮৭ সালে নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য ‘বাখরগঞ্জ হিতৈষিণী সভা’ এবং একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
ক্স ১৮৮৯ সালে ব্রজমোহন কলেজ স্থাপন করেন।
১৯০৫-১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় জাতীয় নেতার স্থান লাভ করেন তিনি। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের মাদ্রাজ অধিবেশনে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেন। জাতীয় কংগ্রেসকে প্রাসাদ রাজনীতি থেকে সাধারণ জনগনের মধ্যে নিয়ে আসার প্রথম কারিগর অশ্বিনী কুমার দত্ত। তার প্রতিষ্ঠিত স্বদেশ বান্ধব সমিতির স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্যে বরিশালকে স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন।

মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত নিঃসন্তান ছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর, তার একমাত্র ওয়ারিশ ভাইপো সরল দত্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি স্থায়ীভাবে ভারতে চলে গেলে, বাসভবনটি ১৯৫৭ সালে অশ্বিনীকুমার স্টুডেন্টস হোম নামে বি এম কলেজের সকল ধর্মের ছাত্রদের সমন্বিত কসমোপলিটন ছাত্রাবাস হিসেবে পরিচিতি পায়।
১৯৬৩ সালে বরিশালের কিছু উদ্যোগী ব্যক্তি মূলত বরিশালের জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এসএসসি বা এইচএসসি পাশ অফিস-সহকারী নিজেদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের প্রত্যাশায় একটি নৈশ কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এদের একটি প্রতিনিধি দল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক জয়ন্ত কুমার দাশগুপ্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্যোগের বিষয়টি জানান। জয়ন্ত কুমার দাশগুপ্ত তাঁর বিদ্যালয়ে নৈশকলেজ শুরু করার সম্মতি দেন এবং সেখানেই নৈশ কলেজের ক্লাস শুরু হয়। তিনি নিজে কলেজে বাংলা পড়াতেন। কলেজের নামকরণ করা হয় ‘বরিশাল নৈশ কলেজ’ বা ‘বরিশাল নাইট কলেজ’। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জনাব আবদুল হক। ব্রজমোহন কলেজের কয়েকজন শিক্ষক এই কলেজে শিক্ষাদান করতেন।
নৈশ কলেজে ছাত্রসংখ্যা বেড়ে গেলে পৃথক ক্যাম্পাসের প্রয়োজন হয়ে পরে। তখন সবাই মিলে (জেলা প্রশাসন, নৈশকলেজ পরিচালনা পর্ষদ, ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ) নৈশকলেজ ‘অশ্বিনী ভবনে’ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৫ সালে নৈশ কলেজ অশ্বিনী ভবনে স্থানান্তরিত হয় এবং ‘অশ্বিনী ভবন কসমোপলিটান ছাত্রবাবাস’ বন্ধ হয়ে যায়।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘অশ্বিনী ভবন’ ও এর বিষয় সম্পত্তি বরিশাল নৈশ কলেজের নামে অধিগ্রহণ করা হয় ১৯৭০ সালে। এর প্রশাসনিক অনুমোদন পত্রে উল্লেখ আছে ‘বরিশাল নৈশ কলেজের জন্য জমি অধিগ্রহণ’। দেশ স্বাধীনের নৈশ কলেজে ‘দিবা শাখা’ খোলা হয়। কলেজে দীর্ঘদিন নৈশ ও দিবা উভয় শাখা চালু থাকে। নৈশ শাখায় ছাত্র সংখ্যা কমতে থাকলে গত শতকের সাতের দশকের শেষের দিকে ‘নৈশ শাখা’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে কলেজের নাম থেকে ‘নৈশ’ কথাটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়।
১৯৮৬ সনের ১৪ নভেম্বর কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের পর সরকারি অর্থায়নে মূল অশ্বিনী ভবনের পিছনে একটি ভবন নির্মিত হয়। মূলত প্রশাসনিক ভবন হিসেবেই এই ভবন। এভাবেই চলতে থাকে সরকারি বরিশাল কলেজ।
১৯৯২-এর ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ একদিন ভেঙে ফেলা হয় মূল অশ্বিনী ভবন। লুট করা হলো সেই খাট, পড়ার টেবিল, ছুঁড়ে ফেলা হলো খড়ম। হিসাব বলে ভারতের অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙার এক সপ্তাহের মধ্যেই ভবনাটি ভেঙে ফেলা হয়। এক উগ্র সাপ্রদায়িক কর্মকাণ্ডের বহিঃপ্রকাশ বিবেচনা করে শহরের কয়েকজন প্রগতিশীল সমাজকর্মী সেখানে গিয়ে ভবন ভাঙায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। ভবন ভাঙার কাজে নিয়োজিত বাহিনীর কাছে তাঁরা টিকতে না পেরে চলে আসেন। পরে তাঁরা কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মকবুল উদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করে এর প্রতিবাদ জানালে, তিনি কথা দেন হুবহু ‘অশ্বিনী ভবনের আদলেই এখানে একটি ভবন নির্মিত হবে। সেই কথা আর বস্তবতার মুখ দেখেনি।
২০০৩ সালের মে মাসে কলেজ কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেয় অশ্বিনী ভবনের তমাল গাছটি কেটে সেখানে কলেজের প্রশাসনিক ভবন তৈরি করবে। সংবাদ পেয়ে শহরের সেই প্রগতিশীল সমাজকর্মীরা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ এ কে এম শামসুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে এর প্রতিবাদ জানালে, তিনি তমাল গাছ কাটা থেকে বিরত থাকেন এবং কথা দেন, তমাল গাছের নিচের চত্তরটি নতুন করে নির্মাণ করে দেবেন। তিনি তা করেননি। এসময় উপরিউক্ত প্রতিবাদকারী সমাজকর্মীরা উদ্যোগ নেন কলেজের মূল ফটকে (পুরাতন) একটি ‘পাকা স্তম্ভ’ তৈরি করে সেখানে ‘অশ্বিনী ভবন’ নাম ফলক প্রতিস্থাপন করা হবে। সেভাবে পুরাতন ফটকের ডান দিকে একটি স্তম্ভ তৈরি করা হয় এবং একটি নামফলকও তৈরি করতে দেওয়া হয়। কিন্তু সেসময়ে বরিশালের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সেই ‘স্তম্ভ’টি এখনো কালের সাক্ষি হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।
মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তকে ধীরে ধীরে বিস্মৃত করে ফেলার নানামুখী অপতৎপরতা শুরু হয়েছে দীর্ঘদিন থেকেই। তাঁর বাসভবন ভেঙে ফেলা, পাকিস্তানী আমলে অশ্বিনী কুমার টাউনহলকে আইয়ুব খানের নামের সঙ্গে মিলিয়ে একে টাউনহল নামকরণ করা, ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়কে বিএম স্কুল ও বিএম কলেজ নামে জনমানসে পরিচিত করে তোলা এই নানামুখী সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল তৎপরতারই অংশ। বরিশালের প্রগতিশীল ও সচেতন মানুষজনের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারী বরিশাল কলেজের নামকরণ এই মহান ব্যক্তির নামে করার সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের বিবেচনাধীন থাকার কথা আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি। আমরা গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, একটি প্রতিক্রিয়াশীল মহল মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে সরকারী বরিশাল কলেজের নামকরণের বিরোধীতার অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছেন প্রকাশ্যে সমবেত হয়ে। আমরা এই অপতৎপরতার তীব্র নিন্দা জানাই।
অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীলতায় বিশ্বাসী সকলের পক্ষ থেকে আমরা এই ধরনের অপতৎপরতা বন্ধে প্রশাসনিক কঠোর উদ্যোগ কামনা করছি। অবিলম্বে সরকারী বরিশাল কলেজের নামকরণ মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে গেজেট নোটিফিকেশন জারি করে নামকরণকে বাস্তবতা দেওয়ার দাবি করছি। মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের ত্যাগ ও অবিস্মরনীয় অবদান আমরা কোনোভাবেই বিস্মৃত হতে দেবো না।
[আবুল কালাম আজাদ খান, শিশু সংগঠক, কেন্দ্রীয় চাঁদের হাট, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here