সিজদা ও কদমবুসির মধ্যে পার্থক্য

0
352


সিজদা আরবি শব্দ। এর অর্থ মস্তক অবনতকরণ, মাথানত করা, মাটিতে কপাল স্পর্শ করা, আনুগত্য স্বীকার করা, হুকুম পালন করা ইত্যাদি। সিজদা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন “আর আমি যখন আদম (আ.)-কে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদের বললাম তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল। সে আদেশ অমান্য করল এবং অহংকার করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।” (সূরা আল বাকারাহ ২: আয়াতা ৩৪)
অন্যদিকে কদমবুসি ফারসি শব্দ, এটির অর্থ পদচুম্বন বা পায়ে চুম্বন করা। হযরত ঝারে (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন “আমরা যখন মদীনায় আগমন করলাম, তখন দ্রুত নিজেদের সওয়ারি হতে অবতরণ করলাম। অতঃপর আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর হাত মোবারক ও কদম মোবারকে চুম্বন করলাম।” (আবু দাউদ শরীফের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৪০২)


কদমবুসি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তি প্রদর্শনের জন্য করা হয়। পক্ষান্তরে সিজদার উদ্দেশ্য ইবাদত করা। সিজদার জন্য চারটি শর্ত রয়েছে। যথা ১। নিয়ত করা, (২) ওযু করা, (৩) কেবলামুখী হওয়া ও (৪) অষ্টঅঙ্গ মাটিতে স্পর্শ করা করে সিজদা করা, অর্থাৎ দু’পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলী, দু’হাঁটু, দু’হাত এবং নাক ও কপাল এই অষ্টঅঙ্গ জমিনে স্পর্শ করে সিজদা করা।


উল্লিখিত এ চারটি শর্ত পালন করা ব্যতীত সিজদা হবে না। আর সিজদার উদ্দেশ্য উপাসনা করা, অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদত করা। মহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেন “তারা কি লক্ষ্য করেনি আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর প্রতি, যার ছায়া ডান ও বাম দিকে ঢলে পড়ে আল্লাহর প্রতি বিনীতভাবে সিজদাবনত হয়? আর আল্লাহকেই সিজদা করে, যা কিছু আছে আসমানে এবং যে সকল জীবজন্তু আছে জমিনে এবং ফেরেশতারাও, তারা অহংকার করে না।” (সূরা আন নাহল ১৬: আয়াত ৪৮ ও ৪৯)


প্রকৃতপক্ষে সিজদা নামাজের একটি অন্যতম রুকন। সিজদার মাধ্যমে বান্দা সুমহান আল্লাহর অতীব নিকটবর্তী হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন “সিজদা অবস্থায় বান্দা তার প্রতিপালকের সর্বাধিক সান্নিধ্যে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা সিজদায় গিয়ে অধিক পরিমাণে প্রার্থনা করো।” (তাফসীরে মাজহারী ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৫)


অতএব সিজদা করা হয় কেবলমাত্র মহান আল্লাহকে। অন্যদিকে কদমবুসি করা হয় আল্লাহর বান্দাকে, এর জন্য কোনো শর্ত নেই। অর্থাৎ ইতিপূর্বে উল্লিখিত সিজদার যে চারটি শর্ত রয়েছে, কদমবুসির ক্ষেত্রে এরূপ কোনো শর্ত নেই। যে কোনো সময়ে পিতামাতা, শিক্ষক কিংবা পির-মোর্শেদকে কদমবুসি করা উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ। এটির উদ্দেশ্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তি প্রদর্শন করা।


অথচ আমাদের সমাজে এরূপ ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, কদমবুসি করতে গেলে মাথা নিচু করতে হয়, আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা নত করাই শিরক। আসলে এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে আমাদেরকে বিভিন্ন প্রয়োজনে মাথা নিচু হয়, যা কখনোই শিরক নয়। যেমন কৃষক যখন ফসল রোপণ করে, তখন তাকে মাথা নিচু করতে হয়। জুতা পড়ার সময় জুতার ফিতা বাঁধতে গিয়ে মাথা নিচু করতে হয়। হাত থেকে কলম বা অন্য কিছু মাটিতে পড়ে গেলে, সেটি উত্তোলন করতেও মাথা নিচু করতে হয়। এমনকি চা পান করতে কিংবা খাদ্য গ্রহণ করতেও মাথা নিচু করতে হয়। অথচ এগুলোকে শিরক বলা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here