সূফী সম্রাটের সংস্কার: হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতা উচ্চ স্তরের মু’মিন

0
138

মুহাম্মদ জহিরুল আলম

বিশ্বনবি হযরত মোহাম্মদ (সা.) হলেন সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, মহান আল্লাহর প্রিয় হাবিব। তাঁর মর্যাদা এতই সমুন্নত যে, তাঁকে না ভালোবাসলে কেউ মু’মিন হতে পারে না; তাঁর উপর দরূদ না পড়লে কারো ইবাদত আল্লাহ্ কবুল করেন না; তাঁর অসিলা ছাড়া কারো প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে মঞ্জুর হয় না; তাঁর সুপারিশ ছাড়া কারো মুক্তি হবে না। তিনি আগমন করবেন বলেই মহান আল্লাহ্ এ পৃথিবী সুন্দর করে সাজিয়েছেন, তিনি বিশ্ব জাহানের রহমত। মহান আল্লাহ্ বলেন, “হে মাহবুব (সা.)! আমি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল আম্বিয়া ২১: আয়াত ১০৭) হযরত রাসুল (সা.) মানবজাতির জন্য সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। সূরা আলে ইমরানের ৮১নং আয়াত থেকে সৃস্পষ্ট যে, পৃথিবীতে আগত সমস্ত নবি ও রাসুলকে একত্রিত করে মহান আল্লাহ্, হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কে মেনে নেওয়া ও তাঁকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। দয়াল রাসুল (সা.)-এর কারণেই সকল কিছু অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে। সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ্ রাসুল (সা.)-এর নুর সৃজন করেছেন এবং সমস্ত সৃষ্টিরাজি হযরত রাসুল (সা.)-এর নুর থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ নুরে মোহাম্মদীই সৃষ্টিজগতের প্রাণ। আল্লাহ্র রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, “মানব সম্প্রদায় উত্তম ও অধম দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে একমাত্র উত্তম শ্রেণিতেই প্রেরণ করেছেন। আমি পিতা-মাতার মাধ্যমেই আগমন করেছি। আর উত্তম জনগোষ্ঠীতে জন্ম নেওয়ার কারণে অধম জনগোষ্ঠীর অজ্ঞতা আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। হযরত আদম (আ.)-এর সময়কাল থেকে প্রত্যেক যুগেই আমি পিতা-মাতার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছি। অতঃপর আমি আমার বর্তমান পিতা-মাতার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছি। (তাফসীরে মাজহারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৬) হযরত রাসুল (সা.) ১২ রবিউল আউয়াল এ ধুলির ধরায় আগমন করেন। আলোচ্য প্রবন্ধে সারোয়ারে কায়েনাত, মুফাখকারে মওজুদাদ, সরকারে দোআলম হযরত মোহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা (সা.)-এর সম্মানিত পিতা হযরত আবদুল্লাহ্ (আ.) ও মাতা হযরত আমিনা (আ.)-এর গৌরবোজ্জ্বল জীবন এবং তাঁদের সুউচ্চ মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.)-এর অনন্য সংস্কার, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতা উচ্চ স্তরের মু’মিন ছিলেন।


যুগে যুগে পৃথিবীতে যত নবি-রাসুল আগমন করেছেন সবাই মানব জাতির কাছে আল্লাহ্র পরিচয় তুলে ধরে একত্ববাদের বাণী প্রচার করেছেন। তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন তারাই মুসলমান। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শ, তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান।” (সূরা আল হাজ্ব ২২: আয়াত ৭৮) হযরত ইব্রাহিম (আ.) প্রায় ৪ হাজার বছর পূর্বে বর্তমান মেসোপোটমিয়ার অন্তর্গত বাবেল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কাবাঘর পুনর্নির্মাণ শেষে হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, “হে আমাদের প্রভু, আমাদের বংশধরদের মধ্য হতে (সেই) একজন রাসুল উত্থিত করো, যিনি তাদের নিকট তোমার বাণী প্রচার করবেন এবং কিতাব (কুরআন) শিক্ষা দিবেন, জ্ঞান দান করবেন এবং তাদেরকে শুদ্ধ করবেন। নিশ্চয়ই তুমি শক্তিমান এবং পরম জ্ঞানী।” (সূরা বাকারাহ ২: আয়াত ১২৯) তাঁদের প্রার্থনা মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশেই হযরত রাসুল (সা.) আগমন করেন। ইতিহাস গবেষণা করলে পাওয়া যায় খ্রিষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে মক্কা নগরী ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মিলন মেলা। মক্কার কুরায়েশগণ ছিলেন পশ্চিম আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃস্থানীয় বংশ। হযরত রাসুল (সা.) কুরায়েশ বংশের ১২টি গোত্রের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ও প্রভাব-প্রতিপত্তিশীল হাসেমি গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।
হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.) ছিলেন তৎকালীন মক্কা নগরীর শাসনকর্তা ও পবিত্র কাবা শরীফের হেফাজতকারী, সর্বজন শ্রদ্ধেয় হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.)-এর সবচেয়ে আদরের সন্তান। হযরত রাসুল (সা.)-এর দাদিজানের নাম ছিল ‘ফাতিমা’। হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.) বিভিন্ন স্থান হতে কাবাঘরে আসা তীর্থযাত্রীদের পানি সরবরাহ করতেন, কিন্তু সে সময় প্রতি বছর সুপেয় পানির অভাব হতো। হঠাৎ একরাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন, কোনো এক অজ্ঞাত মহাপুরুষ তাঁকে বললেন, “হে মুত্তালিব, তোমার পূর্ব পুরুষ হযরত ইসমাইল (আ.)-এর অমর কীর্তি জম্জম্ কূপ, যা উমর জুরহামী কর্তৃক নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, তা তুমি পুনঃআবিষ্কার করো।” এ স্বপ্ন দেখার পর হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.) জম্জম্ কূপ পুনঃআবিষ্কার করার জন্য পূর্ণোদ্যমে চেষ্টা করেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হলেন। হযরত আব্দুল মুত্তালিবের কোনো সন্তান ছিল না। অবশেষে হযরত আব্দুল মুত্তালিব মানত করলেন, আল্লাহ্ যদি আমাকে জম্জম্ কূপের সন্ধান দেন এবং দশটি পুত্র সন্তান দান করেন এবং তারা সবাই যুবক হয়ে যদি আমার সহকারী হয়, তবে আমি একটি পুত্রকে আল্লাহ্র নামে কোরবানি করবো। দয়াময় আল্লাহ্ মানত কবুল করলেন। একদিন তিনি দেখতে পেলেন একখণ্ড মেঘ এসে কাবাঘরের পাশে ছায়া দিচ্ছে, তিনি সে স্থান খুড়ে সেখনেই জম্জম্ কূপের সন্ধান পেলেন এবং একে একে ১০ ছেলের পিতা হলেন। ছেলেরা বড়ো হলে তিনি দশ ছেলেকে নিয়ে কাবাঘরে গেলেন, লটারি করলেন, দেখেন সবচেয়ে আদরের ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর নাম উঠে এসেছে। তিনি মানত আদায়ের জন্য উদ্যত হলে, কাবাঘর প্রাঙ্গণে যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-কে বাঁচিয়ে রেখে মানত আদায় করা যায় কিনা পরামর্শ দিলেন। হযরত আব্দুল মুত্তালিব ইসায়ী ধর্মের অন্তর চক্ষু খোলা একজন আল্লাওয়ালা মহিলার কাছ থেকে সমাধান গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর পরিবর্তে উটের নাম উঠে, ততক্ষণ পর্যন্ত লটারিতে ১০টি করে উটের সংখ্যা বাড়িয়ে নিতে হবে। সে অনুযায়ী যখন উটের সংখ্যা ১০০টি হলো, তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর পরিবর্তে উটের নাম উঠল। তখন তিনি ১০০টি উট আল্লাহর নামে কোরবানি করে মানত আদায় করলেন। একারণেই হযরত রাসুল (সা.) প্রায়শ গৌরবের সাথে বলতেন “আমি দুই কোরবানিকৃত পিতার সন্তান।” (সূফী সম্রাটের যুগান্তকারী ধর্মীয় সংস্কার, ২য় সংস্করণ; ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬ ও ৭৭)


হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর চেহারা মোবারকে এক বিশেষ নুরের জ্যোতি প্রকাশ পেতো। মক্কার জাহেলি পরিবেশ নিরাপদ না হওয়ায় হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.)-এর ঘনিষ্ঠ কুরাইশদের শাখা মদীনার বনু জোহরা গোত্রের সরদার ওয়াহাব বিন আবদ মানাফ-এর পরামর্শে তিনি প্রিয় সন্তানকে মদীনায় পাঠালেন। একদিন হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-কে নিয়ে ওয়াহাব বিন আবদ মানাফ মদীনার এক জঙ্গলে শিকারে গেলেন। বনের মধ্যে একদল ইহুদি অস্ত্র নিয়ে হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-কে ঘিরে ফেলে এবং পরিচয় জেনে বুঝতে পারে তাঁর ঔরসেই এমন এক মহামানব আগমন করবেন, যাঁর কারণে তাদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত হবে। তারা হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-কে হত্যা করতে উদ্ধত হলে, একদল সাদা পোশাকধারী ফেরেশতা ঊর্ধ্বাকাশ থেকে নেমে ইহুদিদের টুকরো টুকরো করে ফেলে। হযরত ওয়াহাব বিন আবদ মানাফ (আ.) এ অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। তিনি বুঝতে পারেন হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.) কোনো সাধারণ মানুষ নন। এ ঘটনার পর থেকেই হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর প্রতি হযরত ওয়াহাব বিন আবদ মানাফের মনে বিশেষ শ্রদ্ধা ও মহব্বত জাগ্রত হয়। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-কে নিজের কাছের মানুষ হিসেবে পাওয়ার জন্য নিজের প্রাণপ্রিয় কন্যা হযরত আমিনা (আ.)-এর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেন। হযরত আমিনা (আ.)-এর মা অর্থাৎ হযরত রাসুল (সা.)-এর নানিজান ‘বারাহ্’ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.)-এর বাড়িতে যান। হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.) এ বিয়েতে সম্মতি জানান এবং বলেন, হে আমার সন্তান! আমিনার মতো আর কোনো মেয়ে নেই; কেননা সে মহানুভব, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, পবিত্র এবং বুদ্ধিমতি একজন মেয়ে। বিয়ের দিন ধার্য করে হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর মা ফাতিমা বলেন, হে আমার সন্তান! আরবের মেয়েদের মধ্যে আমিনার কোনো জুড়ি নেই। আমি তাঁকে পছন্দ করেছি এবং আল্লাহ্ তোমার নুরকে ‘আমিনা’ ব্যতীত কাউকে দান করবেন না। (বিহারুল আনওয়ার, ১৫তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৯) হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.) বিবাহের খুৎবা পাঠ করেন। উপস্থিত চারজনকে সাক্ষী রাখেন এবং চারদিন ব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। (বিহারুল আনওয়ার, ১৫তম খন্ড, পৃষ্ঠা ১০৩)


পৃথিবীর ইতিহসে এক অতুলনীয়া নারী হযরত আমিনা (আ.), তিনি সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠের গর্ভধারিণী। যে যুগে মানুষ কন্যা সন্তানকে গ্রহণ করত না, সে যুগেও তিনি সবার নিকট সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্রী ছিলেন। আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু হতে বর্ণিত, হযরত রাসুল (সা.) বলেছেন- আল্লাহ্ মহানুভব পুরুষদের সুলবে (ঔরশে) এবং পবিত্র মায়েদের গর্ভে আমাকে রেখেছিলেন যেন আমাদের মাঝে কেউ ব্যাভিচারে লিপ্ত না হয়। (কামাল উদ্দিন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯১) কুলাইনী (রহ.) তাঁর ‘কাফি’ নামক গ্রন্থে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.) হতে বর্ণিত ‘জামে’ নামক খুৎবায় উল্লেখ করেন, প্রকৃতপক্ষে হযরত রাসুল (সা.)-এর সৃষ্টিতে কোনো প্রকারের কলুষতার অস্তিত্ব ছিল না, কারণ হযরত রাসুল (সা.)-এর মাতামহগণ কোনো প্রকার অপবিত্রতা ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলেন না। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর রাসুলের জন্মের জন্য সুরক্ষিত গর্ভ এবং আমানতদার মাকে নির্বাচন করেছিলেন। (উসুলে কাফি, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪৭) হযরত আমিনা (আ.) বলেন, মোহাম্মদ (সা.)-এর নুর যখন তাঁর পিতার কাছ থেকে আমার কাছে স্থনান্তরিত হয়, তখন আমার চেহারায় নুর পরিলক্ষিত হতো। মক্কাবাসীরা যখন ঐ নুর আমার মাঝে দেখতে পেতো, তখন তারা আমাকে আগামীতে সুন্দর সন্তানের অভিনন্দন জানাতো। (আনওয়ার ফি মওলুদুন নাবী, পৃষ্ঠা ১২৬)


বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা ও পিতামহসহ পূর্বপুরুষগণ হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ধর্ম তথা দ্বিনে হানিফের (ইসলাম ধর্মের) অনুসারী ছিলেন, তাঁরা মূর্তিপূজক পৌত্তলিক ছিলেন না। হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতামহ হযরত আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন আল্লাহ্তে বিশ্বাসী একজন পূণ্যবান ব্যক্তি। তিনি ব্যক্তি জীবনে একজন আবেদ (ইবাদতকারী) ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। (সূফী সম্রাটের যুগান্তকারী ধর্মীয় সংস্কার, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬) হযরত ওয়াহাব বিন আবদ মানাফের কন্যা হযরত আমিনা (আ.) একেশ্বরবাদী ছিলেন। হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতা কখনো শিরকে লিপ্ত ছিলেন না এবং হযরত রাসুল (সা.)-এর নুর কখনো মুশরিকের ঔরশে এবং গর্ভে ছিল না।


হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.) ও হযরত আমিনা (আ.)-এর বিবাহের কিছুদিন পর হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.) শামে (সিরিয়া) ব্যবসা করার জন্য কাফেলা প্রস্তুত করেন। তিনি পিতা এবং স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নেন, তখন হযরত রাসুল (সা.) মা হযরত আমিনা (আ.)-এর গর্ভে ছিলেন। তখন থেকেই হযরত আমিনা (আ.)-এর সাথি হলো কষ্টের ক্রন্দন। বাণিজ্য সফর শেষে ফিরে আসার পথে ইয়াসরিবে (মদীনা) হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.) অসুস্থ হয়ে আত্মীয়দের কাছে থেকে যান এবং সেখানেই ওফাত লাভ করেন। তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর বয়স হয়েছিল ২৫ বছর।
হযরত রাসুল (সা.) যখন মা হযরত আমিনা (আ.)-এর গর্ভে তখন ইয়েমেনের দুরাচারী বাদশাহ্ আবরাহা পবিত্র ক্বাবাঘর ধ্বংস করার জন্য মক্কা শরীফ আক্রমণ করতে আসে। একদিন সকালে হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.) উৎকন্ঠার সাথে ঘরে প্রবেশ করে মা হযরত আমিনা (আ.)-কে বললেন, আমিনা তৈরি হও। আমাদের মক্কা নগরী ছেড়ে দূরে চলে যেতে হবে। কারণ, আবরাহা বাদশাহ্ মক্কা আক্রমণ করতে আসছে। সে মক্কা দখল করে কাবা শরীফ ধ্বংস করবে। কুরাইশদের উৎখাত করে এদের সমস্ত ছেলে-মেয়েদের ধরে নিয়ে দাস-দাসী বানাবে। একথা শুনে হযরত আমিনা (আ.) বললেন, বাবা! আপনি দেখছেন আমি অসুস্থ ও শোকাহত, আমি এত দুর্বল যে, হেঁটে পাহাড়ে উঠতে পারবো না। হযরত আব্দুল মুত্তালিব (আ.) বললেন, আমার দুশ্চিন্তা তোমাকে ও তোমার গর্ভের সন্তানকে নিয়ে। তখন হযরত আমিনা (আ.) বললেন, বাবা! আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না, কাবাঘরও ভাঙ্গতে পারবে না। কারণ, কাবার মালিক আছেন, তিনিই তা রক্ষা করবেন। আবু রুগাল নামক এক খোদাদ্রোহী পাষণ্ড বাদশাহ আবরাহাকে মক্কায় যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে কী হবে? এরই মধ্যে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেল, মক্কা আক্রমণকারী আবরাহা বাদশাহর প্রকাণ্ড হাতিগুলো মাটিতে হাঁটু গেরে বসে পড়েছে। আর উঠছে না। এক পাও অগ্রসর হচ্ছে না। হাতিকে তোলার জন্য সৈন্যরা লৌহদণ্ড দিয়ে আঘাত করলে হাতি দাঁড়ালো বটে, কিন্তু এক পাও আর সামনে এগুচ্ছে না। এমতাবস্থায় ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর নিক্ষেপ করে বাদশাহ্ আবরাহা ও তার হস্তিবাহিনীকে নির্মূল করে দিলো। হযরত আব্দুল মুত্তালিব ফিরে এসে হযরত আমিনা (আ.)-কে বললেন, মা তোমার কথাই সত্য হয়েছে। হযরত রাসুল (সা.)-এর শুভ জন্মের পূর্বে হযরত আমিনা (আ.) বলতেন যে, হযরত রাসুল (সা.) গর্ভে আসার পর তাঁর কাছে কোনো এক অপরিচিত আগন্তুক আসেন এবং তাঁকে বলেন, “তুমি যাঁকে গর্ভে ধারণ করেছ, তিনি এ যুগের মানবজাতির ত্রাণকর্তা। তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন তখন তুমি বলবে সকল হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এই শিশুকে এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। অতঃপর তাঁর নাম রাখবে মোহাম্মাদ।” তিনি গর্ভে থাকাকালে হযরত আমিনা (আ.) স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর ভেতর থেকে এমন একটা আলোকরশ্মি বেরুলো, যা দিয়ে তিনি সিরীয় ভূখন্ডের প্রাসাদসমূহ দেখতে পেলেন। (সীরাতে ইবনে হিসাম, পৃষ্ঠা ৩৮) হযরত রাসুল (সা.)-এর বয়স যখন ছয় বছর ছয় মাস, তখন হযরত আমিনা (আ.) সন্তানকে নিয়ে হযরত আব্দুল্লাহ্ (আ.)-এর রওজা জিয়ারত করার জন্য ইয়াসরিবে (মদীনা) যান। কিন্তু আল্লাহ্র কী ইচ্ছা, সেখানেই তিনি ওফাত লাভ করেন। তাঁকে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে দাফন করা হয়।


ইতিহাসে আরেকজন মহীয়সী নারীর নাম অত্যন্ত সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় তিনি হলেন তায়েফের সম্ভ্রান্ত হাওয়াজিন বংশের বনু সা’দ গোত্রের হযরত বিবি হালিমা (রা.), যিনি হযরত রাসুল (সা.)-এর দুধ মা ছিলেন। দয়াল রাসুল (সা.)-এর বরকতে হযরত বিবি হালিমা (রা.)-এর সবকিছুতেই অসাধারণ বরকত পরিলক্ষিত হতো। হযরত রাসুল (সা.) হযরত বিবি হালিমা (রা.)-কে সর্বদাই অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। একদিন রাসুল (সা.) নিজের গায়ের চাদর মোবারক খুলে তাঁর দুধ মা-কে বসতে দেন। তখন ঐ মজলিসে অনেক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন, হযরত রাসুল (সা.) তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন- ইনি আমার দুধ মা হযরত হালিমা (রা.)। দয়াল রাসুল (সা.)-এর মুখের ভাষার রুচি-মাধুর্যের কারণে বনু সা’দ গোত্রের ভাষার গৌরবও ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। কোথাও অশ্রদ্ধা-অসম্মানের কালীমা নেই। মহান সৃষ্টিকর্তা নিজেই তাঁদের সবাইকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন।
মুসলিম সমাজে হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা দোয়া করার রেওয়াজ ছিল না। উপরন্তু নিজেদের অজ্ঞতা ও চক্রান্তকারীদের চক্রান্তে জড়িত হয়ে বলে বেড়াতো, হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতা মুসলমান ছিলেন না। হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতার নাম জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেওয়া হতো- আব্দুল্লাহ্ ও আমিনা। তাঁদের নামের সাথে সম্মানসূচক ‘হযরত’ ও ‘আলাইহিস্সালাম’ শব্দ ব্যবহার হয় না। আমরা যারা নিজেদের মুসলমান ও হযরত রাসুল (সা.)-এর উম্মত দাবি করি, যদি হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতাকে সম্মান না করি, তবে রাসুল (সা.)-এর শাফায়াত পাব কী করে?


একবিংশ শতাব্দীর শিরোভাগে পৃথিবীর মানুষকে শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করে নুর বা আলোর চরিত্রে চরিত্রবান করে গড়ে তোলার জন্য ‘নুরে মোহাম্মদী’র ধারক ও বাহকরূপে, যুগের ইমামের সুমহান দায়িত্ব পালন করেছেন মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, আম্বিয়ায়ে কেরামের ধর্মের দায়িত্ব ও বেলায়েত লাভকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেব্লাজান। সূফী সম্রাট হুজুর কেব্লাজান ইসলাম ধর্মে প্রবিষ্ট কুসংস্কারগুলো দূর করে, হযরত রাসুল (সা.)-এর হারিয়ে যাওয়া মোহাম্মদী ইসলামকে জগতের বুকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দয়াল রাসুল (সা.) সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত সত্য তুলে ধরে মানুষকে ‘আশেকে রাসুল’ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। সূফী সম্রাট স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন, হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতার প্রতি মুসলমানদের অবজ্ঞাসূচক আচরণ এক চরম ভ্রান্তি। তিনি পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঐতিহাসিক দলিল দিয়ে প্রমাণ করেছেন, হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতা আল্লাহ্তে বিশ্বাসী মু’মিন ও পূণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা একদিকে মুসলমানদের যেমন ইমানি দায়িত্ব, অন্যদিকে তাঁদের প্রতি দোয়া করার মধ্যেও অপরিসীম রহমত ও বরকত নিহিত রয়েছে।


সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী বলেন, নুরে মোহাম্মদী যে পিতা-মাতার মাধ্যমে জগতে আগমন করেছেন, তাঁরা মু’মিন ছিলেন। বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাঁদের প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার অপরিসীম রহমত ছিল। সে সময় মোহাম্মদী ইসলাম চালু হয়নি, ফলে তাঁরা হযরত রাসুল (সা.)-এর কালেমা পাঠের সুযোগ পাননি। তাঁরা তৎকালীন জামানায় প্রচলিত হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর ‘দ্বিনে হানিফের’ অনুসারী ছিলেন। সুতরাং হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতা শুধু মুসলমানই নন, উচ্চ স্তরের মু’মিন ছিলেন। সূফী সম্রাটের এ অনন্য সংস্কারে হযরত রাসুল (সা.)-এর পিতা-মাতা সম্পর্কে আমাদের মাঝে বিদ্যমান ভ্রান্ত ধারণার অবসান হয়েছে।


একটি শ্রেণি কখনোই হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ‘সুউচ্চ মর্যাদা’ ও তাঁর ‘মোহাম্মদী ইসলাম’কে মেনে নিতে পারেনি। যেখানেই মোহাম্মদী ইসলামের আলো প্রস্ফুটিত হয়েছে, সেখানেই অন্ধকার কালো ছায়ায় তারা অবস্থান নিয়ে কাছ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। চৌদ্দশত বছর পূর্বে ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে, কীভাবে নবি পরিবার ও আহলে বাইতকে হত্যা করা হয়েছে। মানব মস্তিষ্ক কতটুকু বিকৃত হতে পারলে তা সম্ভব! সেখানে হযরত রাসুল (সা.) ও তাঁর পরিবার নিয়ে ভ্রান্ত মতবাদ ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন কিছু নয়। সংকট তখনই, যখন মুক্তিকামী মানুষ এ সকল মোনাফেক দ্বারা বিভ্রান্ত হয়। সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (রহ.) তাঁর কর্মময় জীবনে, সমাজে প্রচলিত প্রতিটি ভ্রান্ত মতবাদ মানুষের সামনে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করে সংশোধন করেছেন। তিনি আশেকে রাসুলদের রক্ষা করতে যেয়ে, তীব্র প্রতিকূলতার মাঝে ফেৎনার বিরূদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যা সাধারণ কারো পক্ষে সম্ভব নয়। অসংখ্যবার তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন, সবাইকে সতর্ক করেছেন। এ প্রতিশ্রুত মহামানব ওফাতের পূর্বে অছিয়তনামা প্রদান করেন। সেখানে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “এই তরিকা আমার সাজানো বাগান। আমি এটা জলে ভেসে যেতে দেবো না। এই যুদ্ধে কদর [সম্মানিত মেজো সাহেবজাদা ইমাম ড. আরসাম কুদরত এ খোদা (মা. আ.) হুজুর] যদি আমার পাশে এগিয়ে না আসত, তাহলে তোমাদের অস্তিত্ব থাকত না।” মহান মোর্শেদের কদম মোবারকে প্রার্থনা আমরা যেন তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করতে পারি। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here