সূফী সম্রাট মোহাম্মদী ইসলামের জ্বলন্ত প্রদীপ

4
717

মুহাম্মদ আবদুল হামিদ
যুগশ্রেষ্ঠ মহামানব, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মহান সংস্কারক মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরী এবং মহান আল্লাহ পাকের বন্ধু। সুদীর্ঘ সময় কঠিন আত্মিক সাধনা করে তিনি মহান আল্লাহর পরিচয় পেয়েছেন এবং হযরত রাসুল (সা.)-এর স্বরূপ মানবজাতির কাছে প্রকাশ করেছেন। আত্মশুদ্ধি, দিল জিন্দা, নামাজে হুজুরি তথা একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করা সূফী সম্রাট হুজুরের প্রধানতম শিক্ষা। মূলত তা মোহাম্মদী ইসলামেরই শিক্ষা। এই শিক্ষায় যারা শিক্ষিত তাঁরা বাহ্যিক ও আত্মিক জগত সম্পর্কে অবগত এবং তাঁরাই সফলকাম।

পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, “আমিতো বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা বোঝে না, তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। এরা পশুর মতো, বরং তার চেয়েও পথভ্রষ্ট। এরাই উদাসীন।” (সূরা আ’রাফ: আয়াত ১৭৯) পবিত্র কুরআনের এই আয়াতে বোঝা গেল- বাহ্যিক হৃদয় দ্বারা বাহ্যিক জগতের পরিচয় জানা, চোখ দিয়ে দেখা ও কান দ্বারা শোনা ছাড়াও আত্মিক হৃদয়, চোখ ও কান রয়েছে। আরো এরশাদ হয়েছে, “এরাই তারা, আল্লাহ্ যাদের হৃদয়, কান ও চোখ মোহর করে দিয়েছেন, আর ওরাই তো গাফেল। নিশ্চয়ই এরা আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সূরা নাহল: আয়াত ১০৮-১০৯)

আয়াতদ্বয়ের আলোকে স্পষ্টই প্রমাণ হয় যে, বাহ্যিক জগত ছাড়াও আর একটি জগত আছে, যা ‘আত্মিক জগত’ নামে পরিচিত। সৃষ্টিজগত দুইভাগে বিভক্ত। বস্তুজগত ও আত্মিক জগত। বস্তু বা দৃশ্যমান জগতের সাথে আমরা দৈহিকভাবে নানা কলা-কৌশল তথা নিয়ম পদ্ধতির মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকি। বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে ইন্টারনেট, ই-মেইল. সেল ফোন, ফ্যাক্স, বেতার যন্ত্র, টেলিভিশন ইত্যাদির সাহায্যে আমরা এক স্থানে বসে সমগ্র বিশ্বের খবরাখবর এমনকি ব্যক্তির ছবি দেখি ও তাৎক্ষণিক কথা শুনে থাকি। বিজ্ঞানের অবদানে আমরা আলোর গতির সাথে তাল মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘরে বসে পৃথিবীর যে কোনো স্থানে যোগাযোগ করছি প্রতিনিয়ত। আবার দৃশ্যমান জগতে এমন কিছু আছে যা আমরা চোখে দেখি না, অনুভব করি মাত্র। যেমন বাতাস, আমাদের গায়ে ধাক্কা খায়, ঝড়-ঘূর্ণিঝড় মুহূর্তে তছনছ করে দেয় জনবসতি। কিন্তু এই বাতাসকে আমরা দেখতে পাই না, তবে এর আঘাত আর ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করি ঠিকই। শরীরের কোথাও ব্যথা পেলে এর তীব্রতা অনুভব করি মাত্র, কিন্তু ব্যথাকে দেখতে পাই না, এমন আরো অনেক বিষয় রয়েছে, যা আমরা অনুভব করি, দেখতে পাই না। তাই বলে এগুলোকে অবিশ্বাস করার কোনোই সুযোগ নেই। আত্মিক বা অদৃশ্য জগত হলো অত্যন্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও রহস্যময়। এই জগতের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য বস্তুজগত বা দৃশ্যমান জগতের যোগাযোগ মাধ্যম সম্পূর্ণ অচল। একমাত্র পরিশুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত আত্মার সাহায্যেই আত্মিক জগতের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করা যায়, আর এই শিক্ষাই সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান দিয়ে থাকেন। হযরত রাসুল (সা.) দীর্ঘ ১৫ বছর নির্জন হেরা গুহায় ধ্যান সাধনার মাধ্যমে যে বিদ্যা লাভ করেছিলেন সেটাই মোহাম্মদী ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। সময়ের ব্যাবধানে এই ধ্যান সাধনার বিদ্যা বিলুপ্ত হওয়ার পর আবারো তা সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান ইসলাম ধর্মে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিজ্ঞানের চরম উন্নতির যুগেও আমরা অনেকেই আত্মিক জগত সম্পর্কে নানা মত পোষণ করে থাকি। এও মনে করি যে, আত্মিক জগত সম্পর্কে চিন্তা করারও কোনো প্রয়োজন নেই, আর তা করলে ইমানহারা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার অনেকেই মনে করে থাকে যে, আত্মিক জগত শুধু কল্পনারই জগত। প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মহান আল্লাহর পক্ষ হতে আগত নবী-রাসুলগণ ও পরে তাঁদের উত্তরসূরী অসংখ্য মহামানব এবং তাঁদের অনুসারীগণ আত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরা মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয়তম বন্ধু হযরত রাসুল (স.)-এর দিদার লাভে ধন্য হয়েছেন, জেনেছেন স্রষ্টা ও সৃষ্টির রহস্য। কিন্তু বিজ্ঞানের এই চরম উন্নতির যুগেও আত্মিক জগতের সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত নই, এটা আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতা। আর এজন্য পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “যে ইহলোকে অন্ধ সে পরলোকেও অন্ধ এবং আরো বেশী পথভ্রষ্ট।” (সূরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ৭২)
দেহ আর আত্মার সমন্বয়েই মানুষ। আত্মা ছাড়া দেহ মৃত লাশ। আর প্রত্যেক মানুষই মূলত দুটি দেহের অধিকারী। একটি তার জৈবিক বা জড় দেহ যা রক্ত মাংস ও হাড্ডিযুক্ত, অপরটি হচ্ছে আলোক বা ইথারিক দেহ, যা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু আলোক দেহধারীর ছবি দেখা যায় ও তার কথাও শোনা যায়, যা টেলিভিশন নামক যন্ত্রের দ্বারা প্রমাণিত। আত্মিক জ্ঞান অর্জনের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে সবিস্তারে বর্ণিত রয়েছে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব আল্লাহই এবং সব কিছুকে আল্লাহ্ পরিবেষ্টন করে আছেন।” (সূরা নিসা : আয়াত ১২৬) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, “তিনি (আল্লাহ) যাকে ইচ্ছা হিকমত (বিশেষ জ্ঞান) প্রদান করেন এবং যাকে হিকমত প্রদান করা হয়, তাকে প্রভুত কল্যাণ দান করা হয় এবং বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই শুধু শিক্ষা গ্রহণ করে।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২৬৯)

প্রথমোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ পাক বিশ্বজাহানের মালিক এবং সমগ্র বিশ্বজগত তিনি পরিবেষ্টন করে আছেন। অর্থাৎ তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতে বিরাজমান। পরের আয়াতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ্ দয়া করে যাকে ইচ্ছা তাকেই ‘হিকমত’ তথা বিশেষ জ্ঞান (তাঁকে জানার জ্ঞান) দান করেন। আর যাকে ওই বিশেষ জ্ঞান দান করেন, তাঁকে প্রভুত কল্যাণও দান করে থাকেন। আর বোধশক্তিসম্পন্ন অর্থাৎ বিশেষ জ্ঞানের অধিকারীগণই প্রকৃত শিক্ষা লাভের ক্ষমতা রাখেন। মহান আল্লাহর জ্ঞানে যারা জ্ঞানী, তারা সাধারণ মানব নন বরং তারা বিশেষ মর্যাদাশীল ব্যক্তি, তাঁরা আল্লাহ্ পাকের মনোনিত ব্যক্তি, তাঁরা আল্লাহর বন্ধু বলে পরিগণিত। আল্লাহ্ বন্ধুগণই আত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগের ক্ষমতা রাখেন এবং অপরকেও আত্মিক জগতের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন। সৃষ্টির শুরু থেকে যত নবি-রাসুল জগতে আগমন করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মহান আল্লাহর সাথে যোগাযোগ রেখে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী ধর্ম প্রচার এবং মানব জাতির হেদায়েতের কাজ করেছেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাঁর নিজ সম্পর্কে এরশাদ করেন, “তিনি (আল্লাহ) আদি, তিনিই অন্ত, তিনি প্রকাশ, তিনি গুপ্ত এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক অবহিত।” (সূরা হাদিদ : আয়াত ৩) অর্থাৎ সৃষ্টিজগত সৃজনের আগে মহান আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোনো কিছুই ছিল না, সৃষ্টিজগত ধ্বংস হওয়ার পরও তিনি থাকবেন, তিনি সৃষ্টির মাঝেই নিজেকে প্রকাশ করেছেন, আবার তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে গোপন অবস্থায় আছেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “আমি গুপ্ত ধনাগারে ছিলাম, নিজেকে প্রকাশ করতে ভালোবাসলাম। তাই সৃষ্টিজগত সৃজন করলাম।” (সিররুল আসরার) অর্থাৎ আল্লাহ গোপনে না থেকে নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছা করলেন এবং সৃষ্টিকেই তাঁর ভালোবাসার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ আরো বলেন, ‘‘মানবজাতি আমার গুপ্ত ভেদ এবং আমি মানুষের গুপ্ত রহস্য।’’ (সিররুল আসরার) মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। সমগ্র সৃষ্টিরাজির উপর প্রাধান্য বিস্তার করার ক্ষমতা মানুষকে দেওয়া হয়েছে। এরপরও মানুষ হিসেবে আমরা আত্মিক জগতের কথা ভাবি না, আল্লাহর দিদার লাভের চিন্তা করি না বা কী করে তাঁর দিদার লাভ করা যায়। সেই পথের সন্ধানও করি না। অথচ মহান আল্লাহ মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্যই ছিল- মানুষের মাধ্যমে তাঁর গুণাবলি প্রকাশ করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “পৃথিবীর সব গাছ যদি কলম হয়, আর এই সাত সমুদ্রের সঙ্গে যদি আরো সাত সমুদ্র যোগ দিয়ে কালি হয়, তবুও আল্লাহ গুণাবলি লিখে শেষ করা যাবে না। আল্লাহতো শক্তিমান তত্ত্বজ্ঞানী।” (সূরা লোকমান : আয়াত ২৭)

এই অসীম গুণাবলির অধিকারী মহান আল্লাহ গোপন অবস্থা থেকে প্রকাশ পেয়ে তাঁর গুণাবলির বিকাশ ঘটাতে চেয়েই মানব সৃষ্টি করেন। আল্লাহ মানুষকে এতো উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন যে, তাঁর প্রতিনিধি করে মানুষকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ প্রদত্ত এই উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে আমরা নিজেরাই হয়ত অনেকে জানি না। এছাড়া মানুষের সার্বিক প্রয়োজনে এই সৃষ্টিজগত সৃজিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন, “তোমরা কি দেখ না আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন?” (সূরা লোকমান : আয়াত ২০)

বস্তুত আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত কারো চলার শক্তি নেই। আরো এরশাদ হয়েছে, “তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং তাকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন; তিনি সর্ব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” (সূরা বাকারা : আয়াক ২৯) এই সৃষ্টিজগত দুইভাগে বিভক্ত। যার একটি হলো- বস্তুজগত বা দৃশ্যমান জগত, আর অপরটি আলোকময় তথা আত্মিক জগত। আর সেই জগত অনন্ত অসীম। সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান আত্মিক জগতের দিশারী এবং অপরকেও ঐ জগতের সাথে যোগাযোগ করাতে সক্ষম। এজন্যই তিনি মোহাম্মদী ইসলামের জলন্ত প্রদীপ।

মানুষ প্রধানত দুটি আত্মার অধিকারী। একটি জীবাত্মা বা নফস, যা মানব সৃষ্টির ৪ উপাদান যথা-আগুন, পানি, মাটি ও বায়ুর সমন্বয়ে সৃষ্ট এবং অপরটি পরমাত্মা বা রূহ, যা মহান আল্লাহ হযরত আদম (আ.)-এর মাঝে তাঁর রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন। আমরা সবাই হযরত আদম (আ.)-এর সন্তান হিসেবে আমাদের মাঝেও রূহ বিদ্যমান। জীবাত্মা অত্যন্ত শক্তিশালী। এই জীবাত্মাই মহান আল্লাহ সত্তা রূহকে ধারণ করেছে। আর রূহই হচ্ছে মানুষের কাছে আল্লাহর আমানত। জীবাত্মা মূলত স্বচ্ছ ও পরিশুদ্ধ। কিন্তু এর কিছু শত্রু আছে, যেগুলো নফসকে আক্রান্ত করে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই ষড় রিপুগুলো নফসকে কলুষিত করে। যেমন জীবাণু মুক্ত পানি পান করে জীবের জীবন রক্ষা পায়। যদি পানিতে বিষ মিশ্রিত হয় তখন পানি হয় বিষাক্ত। আর এই বিষাক্ত পানি পান করলে জীবের প্রাণনাশ হয়। তেমনি পরিশুদ্ধ জীবাত্মা যখন ষড়রিপু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন তা কলুষিত হয়ে যায় এবং দুনিয়ার লোভ আর ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। অশান্তি সৃষ্টি হয় ব্যক্তি জীবন থেকে সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় জীবন পর্যন্ত। কলুষিত নফসধারী ব্যক্তি শান্তি ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে অশান্তির পথে ধাবিত হয়। কাজেই জীবাত্মা যাতে ষড়রিপু দ্বারা আক্রান্ত হতে না পারে সেজন্যই আত্মশুদ্ধি লাভ করা প্রয়োজন। পরিশুদ্ধ জীবাত্মা হলো বাহন আর রূহ হলো সওয়ারি। এই দু‘য়ে মিলে আত্মিক জগত ভ্রমণ করতে পারে এবং আত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, কী করে ষড়রিপুর আক্রমণ প্রতিরোধ করে জীবাত্মাকে পরিশুদ্ধ করা যায়। জীবাত্মাকে নফস নামেও অভিহিত করা হয়। হযরত রাসূল (স.) বলেছেন, ‘‘নফসের সাথে যুদ্ধ করাই প্রকৃত জেহাদ।” তিনি আরো বলেন, “যে নিজেকে (নিজের নফসকে) চিনতে পেরেছে, সে তার প্রভুকে চিনতে পেরেছে।” তাহলে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে, হযরত রাসুলে পাক (সা.)-এর শিক্ষা পদ্ধতি কী ছিল? তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। সুদীর্ঘ ১৫ বছর হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় ধ্যান সাধনা তথা মোরাকাবা করেছেন। মক্কা থেকে ৩ মাইল দূরে যে হেরা পর্বতের গুহা প্রায় দেড় হাজার বছর পরও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে, যেখানে উঠতে হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রেমিকদের আজো হিমসিম খেতে হয়, সেই নির্জন মরু পাহাড়ের গুহায় তিনি যৌবনের ১৫টি বছর ধ্যান সাধনায় কাটিয়েছেন। এই ধ্যান সাধনার বিদ্যার মাধ্যমেই তিনি তাঁর প্রভুর সন্ধান পেয়ে পবিত্র বাণী প্রাপ্ত হয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর অনুসারী তথা মুসলিমদেরকে সেই ধ্যান সাধনার বিদ্যাই শিক্ষা দিয়েছেন। আর ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে নিজেদের জীবাত্মা তথা নফসকে পরিশুদ্ধ করে (আত্মশুদ্ধি লাভ করে) মহান আল্লাহ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রেমে দেওয়ানা হয়ে গিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম কাফেরদের শত অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন হাসিমুখে। তাঁরা নিজেদের ধন-সম্পদ, আত্মীয়স্বজনের মায়া পরিত্যাগ করে হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রেমে জন্মভুমি মক্কা ছেড়ে তাঁর সাথে মদিনায় হিজরত করেছেন। অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করে হাসিমুখে শহীদের মর্যাদা লাভ করেছেন। আমরা সেই জাতি, উম্মতে মোহাম্মদী, মোহাম্মদী ইসলামের অনুসারী। পরম সৌভাগ্য যে, আল্লাহ আমাদেরকে দয়া করে উম্মতে মোহাম্মদীর মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যে শিক্ষায় নিজের জীবাত্মা বা নফসকে পরিশুদ্ধ করা যায়, যে শিক্ষায় আত্মশুদ্ধি লাভ করা যায়, সেই মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা, ধ্যান সাধনার শিক্ষা, মোরাকাবার শিক্ষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ফলে নফসের খায়েসে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে দুনিয়া লোভী হয়ে পাপাচারের মাধ্যমে যেমন নিজেদেরকে (জীবাত্মা বা নফসকে) কলুষিত করে অশান্তিতে ভুগছি, তেমনি আমাদের এমন কার্যাদিতে সমাজেও অশান্তি বাড়ছে। ধর্ম পালন করেও ধর্মের প্রকৃত স্বাদ বা ফল আমরা ভোগ করতে পারছি না।

হযরত রাসুল (সা.)-এর যুগে তাঁর কাছ থেকে সাহাবায়ে কেরাম ধ্যান সাধনার বিদ্যার মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করে ধর্ম পালন করত। শান্তির পথে চলার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। এমনকি তাঁরা আত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগ করতেও সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা ছিলেন উজ্জল নক্ষত্র। আর তাঁরা তা করতে পেরেছেন, হযরত রাসূল (সা.)-কে অনুসরণ করে। হযরত রাসুল (স.) বলেছেন, “শরিয়ত আমার কথা, তরিকত আমার কাজ, হাকিকত আমার অবস্থা এবং মারেফাত আমার নিগূঢ় রহস্য।” হযরত রাসূল (সা.) তাঁর অনুসারীগণকে শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতের বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। শরিয়ত যেমন দেহ পরিষ্কার করে, তেমনি মারেফাত আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জনে সহায়তা করে। হযরত রাসুল (স.)-এর ওফাত লাভের পর চার খলিফার যুগ পর্যন্ত হযরত রাসুল (সা.)-এর মৌলিক শিক্ষা চালু ছিল। পরবর্তীতে বিশেষ করে কারবালার যুদ্ধের পর কুখ্যাত এজিদ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইসলাম হয়ে পড়ে শুধু শরিয়ত সর্বস্ব। বেলায়েতের যুগে যাঁরা এজিদের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন, তাঁরা ছিলেন মোহাম্মদী ইসলামের প্রকৃত ধারক ও বাহক। আর তাঁদের মাধ্যমেই দুনিয়াতে টিকে আছে প্রকৃত মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা- এলমে শরিয়ত ও এলমে মারেফাত, যা মানুষের বাহ্যিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধতা আনয়ন করে। বেলায়েতের যুগে অসংখ্য অলী-আল্লাহ, মোর্শেদ তথা পথপ্রদর্শক জগতে আগমন করেছেন, যাঁরা হযরত রাসুল (সা.)-এর শিক্ষায় মানুষকে শিক্ষিত করেছেন। যাঁরা শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতের বিদ্যা শিক্ষা লাভ করে ধর্ম পালন করেছেন, তাঁরাই সফলকাম হয়েছেন।

সময়ের ব্যবধানে, যুগের পরিবর্তনে হযরত রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা তথা মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা জগত থেকে বিলুপ্ত প্রায়, মুসলিম জাতি যখন এলমে মারেফাত ছেড়ে দিয়ে এলমে শরিয়ত সর্বস্ব হয়ে পড়ে, আত্মিক পরিশুদ্ধতা বিহনে মানুষ যখন অশান্তিতে নিপতিত, ঠিক তখনই আল্লাহর মহান বন্ধু, হযরত রাসুল (সা.)-এর উত্তরসূরী, সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী হুজুর কেবলাজান জগতে আগমন করেন। তিনি একদিকে যেমন মহান আল্লাহর পরিচয় ও হযরত রাসূল (সা.)-এর স্বরূপ উদ্ঘাটন করে জগতবাসীর কাছে প্রকাশ করেছেন, তেমনি যুগের মানুষকে শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতের বিদ্যা শিক্ষা দিয়ে প্রকৃত আশেকে রাসুলের মর্যাদায় উন্নীত করছেন। তিনি একজন আদর্শ মোর্শেদ তথা ইসলাম ধমের্র পথপ্রদর্শক। হযরত রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা লাভ করে কী করে বাহ্যিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করা যায়, সেই পথ তিনি দেখিয়ে থাকেন। তাঁর প্রদর্শিত পথে চলে যারা সফলকাম হয়েছেন, তারাই প্রকৃত মুমেন বা আশেকে রাসুল। আর একজন মুমেন তথা আশেকে রাসুলই পারেন আত্মিক চরম উৎকর্ষতার সুবাদে ধর্ম পালন করে শান্তিতে বসবাস করতে। শরিয়ত ও মারেফাতের জ্ঞান অর্জন এবং জীবাত্মা বা নফসকে ষড়রিপুর তাড়নামুক্ত রাখতে মোর্শেদের সান্নিধ্য লাভ ও তাঁর শিক্ষা পদ্ধতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। মোর্শেদকে অনুসরণ ও তাঁর খেদমতের মাধ্যমেই আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করা যায়।

সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান বর্তমান যুগের মানুষের মুক্তির একমাত্র দিশারী। তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদিস গবেষণা করে মানুষের মুক্তির পথের সন্ধান প্রদানে জগতের মানুষকে আশেকে রাসুল হওয়ার মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁর জন্ম না হলে মহান আল্লাহ ও হযরত রাসূল (সা.)-এর স্বরূপ জগতবাসী জানতো না। তিনি আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-কে যতটুকু চিনেছেন এবং জগতবাসীকে চিনিয়েছেন, সেটাই চূড়ান্ত। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, তাঁর মতো মহামানবের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছি। আশা করব সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের সান্নিধ্যে যারা আসেননি, তারা যেন নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করার জন্য জগতশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের সান্নিধ্যে আসার চেষ্টা করেন।

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here