স্মার্টফোন যেভাবে স্মার্টলি আমাদের নীরবে আক্রমণ করে যাচ্ছে!

0
240

প্রযুক্তি যে দিনদিন আমাদের জীবনযাত্রা সহজ এবং আরামদায়ক করে দিচ্ছে এতে আমাদের কারো সন্দেহ থাকার অবকাশ নাই। সকাল থেকে রাত বলা যায় আমরা বিভিন্ন প্রযুক্তির সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছি। এর মাঝে আমাদের সারাদিনের কর্মকাণ্ডে যেসব যন্ত্র একেবারে না হলেই নয় এমন হয়ে গেছে তার মাঝে অন্যতম হলো মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার ইত্যাদি। ইদানীং মোবাইল ফোন আবার স্মার্ট ভাবে আমাদের সামনে হাজির হয়ে স্মার্টফোন খেতাব পেয়েছে। আগের মতো ফোন এখন শুধু কল করা কিংবা রিসিভ করা, মেসেজিং এসবে সীমাবদ্ধ নেই। কি না করা যায় এখন ফোন দিয়ে! ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন দুনিয়া হাতের মুঠোয় বলা যায়। আর দুনিয়া হাতের মুঠোয় নিয়ে চলা যায় এমন সবচেয়ে ছোট, পরিবহনযোগ্য যন্ত্র হল স্মার্টফোন। তবে আমাদের আজকের আলোচনা স্মার্টফোন নিয়ে নয়। বরং স্মার্টফোনের খারাপ দিক নিয়ে।

স্মার্টফোনের খারাপ দিক

প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহার যেমন আমাদের জীবন যাত্রা কে অনেক সহজ করে দিতে পার, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের ক্ষতিই করে। এবং সেই ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনা। ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক সব জায়গায় এর লক্ষণীয় খারাপ প্রভাব পড়ে।

অনেকেই হয়ত বলবে স্মার্টফোন তো সারাদিন দরকারেই ব্যবহার করা লাগে। সবার সাথে যোগাযোগ রাখা থেকে শুরু করে বিনোদন, আমাদের চলাফেরা, ম্যাপ, আমাদের শপিং লিস্ট, রুটিন, এলার্ম, ইত্যাদি সহ দৈনন্দিন জীবনের অনেক বেশি কাজ ই তো এই ছোট ডিভাইসটি দিয়ে আমরা করে থাকি। সুতরাং এটি কম ব্যবহার করা কিভাবে সম্ভব! স্মার্টফোনের খারাপ দিক ই বা কিই?

চলুন জেনে নেয়া যাক আমাদের প্রিয় স্মার্টফোনের খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে

১। আসক্তি

আমেরিকায় সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে একজন কলেজ স্টুডেন্ট দিনে গড়ে ১০ ঘন্টা ফোন ব্যবহার করে। হতে পারে সেটি ইন্টারনেট ব্রাউজিং ব্যবহার কিংবা পিডিএফ ফাইল পড়া কিংবা মেসেজিংসহ বিভিন্ন কাজে এবং দিনে তারা বিভিন্ন সোশ্যাল সাইট সহ যতগুলো মেসেজ আদান প্রদান করে তত কথা তারা সারাদিনে কারো সাথে বলে না।

আরেকটা সার্ভে তে দেখা গেছে আমেরিকার প্রতি ৫ জন স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৩ জনই ৬০ মিনিটের বেশি একবারও ফোন চেক না করে থাকতে পারে না। পুরা বিশ্বেই স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের অবস্থা কম বেশি এমন এবং কাউকে যদি বলা হয় ফোন ছাড়া থাকতে হবে তার মাঝে একরকম ভয় দেখা দেয়। যাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন নোমোফোবিয়া (হড়সড়ঢ়যড়নরধ)।

২। স্মার্টফোন ছাড়া থাকা আমাদের কষ্টকর অনুভূতি তৈরি করে

২০১১ সালে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০০০ ছাত্র-ছাত্রীর উপর একটি জরিপ করা হয়। তাদের ২৪ ঘন্টা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, সোশ্যাল সাইট থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রী এর মাঝে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। তাদের দেখে মনে হয়েছিল তারা অনেক বেশি একা হয়ে গেছে। এমন কি অনেকে শেষ পর্যন্ত পারেইনি ২৪ ঘন্টা দূরে থাকতে।

৩। ব্যাক পেইন সমস্যা

ইৎরঃরংয ঈযরৎড়ঢ়ৎধপঃরপ অংংড়পরধঃরড়হ এর মতে গত কয়েক বছরে তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাকপেইন সহ মেরুদন্ডের নানা সমস্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। ২০১৫-এর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছরের মাঝে ৪৫% তরুণ ব্যাকপেইন-সহ মেরুদন্ডের নানা সমস্যায় ভুগছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, মেরু রজ্জুর উপর বাড়তি প্রেশার দেওয়ার কারণে এবং এই সংখ্যা ২০১৪-এর তুলনায় ৬০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এই ক্ষেত্রে তারা স্মার্টফোনে বিভিন্ন টেক্সটিং-কে বেশি দায়ী করছেন। ২০১৪-এর এক গবেষণা অনুযায়ী টেক্সট করতে গেলে আমাদের মেরুদন্ড কে আমরা যে কোণে বাঁকিয়ে থাকি এবং এতে মেরুদন্ডে যে পরিমাণ চাপ পড়ে তা ৫০ পাউন্ড এর সমান। যা একটি সুস্থ স্বাভাবিক ৭ বছরের বাচ্চার ওজনের সমান। কি ভয়ংকর তাই না!

৪। স্নায়ু সমস্যা

স্মার্টফোন স্নায়বিক সমস্যার জন্যও দায়ী। অতিরিক্ত স্মার্টফোন  ব্যবহারের ফলে আমাদের মেরুদন্ডের শুরু থেকে মস্তিষ্কে যে স্নায়ুর সাহায্যে সংযোগ স্থাপিত আছে তা অতিরিক্ত চাপে সংকুচিত হয়ে যায় কিংবা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ফলাফল হিসেবে দেখা দিতে পারে তীব্র মাথাব্যাথা সহ মাইগ্রেন সমস্যা। মাইগ্রেন যাদের আছে তারাই বুঝে এটা কি জিনিস এবং এই সমস্যাকে বলা হয় ঙপপরঢ়রঃধষ হবঁৎধষমরধ।

৫। উদ্বিগ্নতা এবং হতাশা

স্মার্টফোন যে শুধু শারীরিক বা মানসিক সমস্যা তৈরি করে তা নয়। এর অতিরিক্ত ব্যবহার আপনাকে মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন এবং হতাশ করে তুলবে। সোশ্যাল সাইটগুলোতে যত যাবেন আপনি হয়ত দেখবেন সবার মুহূর্তের মুহূর্তের আপডেট। যা আপনার মাঝে ইনফিরিয়র কমপ্লেক্সিটি-সহ নানা মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করবে। নিজের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে আপনার মাঝে আবার চেষ্টা করার শক্তি কমিয়ে দিবে। আপনাকে হতাশ করে তুলবে। এছাড়া স্মার্টফোনে অতিরিক্ত গেম খেলা আপনার অনেক প্রয়োজনীয় কাজ আপনাকে সুষ্ঠুভাবে করতে দিবে না। বরং এসব আসক্তি আপনাকে সামাজিকভাবে মানুষ থেকে দূরে রাখবে। যা সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের পথে বাধা।

৭। মানসিক চাপ

স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহার মানে সবাই আপনাকে সবসময় সুলভ ভাববে। ভাববে কল, টেক্সট, সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশান, মেইল  এসব আপনি যে কোনো সময় রিপ্লাই দিতে সক্ষম। আপনার নির্দিষ্ট কোনো ওয়ার্কিং সময় বলতে কিছু থাকবে না। যা আপনার জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে আমরা দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে চাই। কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের সবার সাথে বেশি যোগাযোগ এর বদলে আরো বেশি একা করে দেয়।

৮। ঘুমের ব্যাঘাত

২০১৩ এর এক জরিপ অনুযায়ী ১৮ থেকে ২৯ বছরের ৬৩% মানুষ ঘুমানোর সময় তাদের স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট বিছানায় নিয়ে যায় এবং ৩০ থেকে ৬৪ বছরের ৩০% মানুষও এই একই কাজ করে। চিন্তার ব্যাপার হলো, সেপ্টেম্বর ২০১৫ তে পাবলিশ হওয়া এক গবেষণা অনুযায়ী, ঘুমানোর আগে ফোন বা ট্যাবলেটের নীল আলো আপনার ঘুমের যতটা ব্যাঘাত ঘটাবে একটা ডাবল এসপ্রেসো কফিও সেটা পারবে না। যদিও আমরা ঘুমানোর আগে ডাবল এসপ্রেসো কফি নিয়ে কেউ বিছানায়  যাই না। কিন্তু ফোন বা ট্যাবলেট নিয়ে যাই।

৯। ব্যাকটেরিয়ার গুদাম ঘর

আমেরিকার টহরাবৎংরঃু ড়ভ অৎরুড়হধ-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, একটি টয়লেট সিটের উপরিভাগে যে পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া থাকে তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে আমাদের স্মার্টফোনে। আমাদের টয়লেট আমরা নিয়মিত পরিষ্কার করলেও স্মার্টফোন পরিষ্কার করা হয় না। আর টয়লেট সিট যতই পরিষ্কার থাকুক আমরা অবশ্যই সেখানে কেউ মুখ ঘষি না। কিন্তু কোনো সঠিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার ছাড়াই আমাদের ফোন সারাদিন আমরা হাতে রাখি, কল আসলে মুখে লাগাই।

১০। দৃষ্টি-শক্তির সমস্যা

স্মার্টফোনের খারাপ দিকের মাঝে উল্লেখযোগ্য আরেকটি সমস্যা হলো এটি আমাদের দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি করতে পারে। স্মার্টফোনের নীল আলো আমাদের রেটিনার জন্য ক্ষতিকর। টানা অনেকক্ষণ ধরে অতিরিক্ত পরিমাণ স্মার্টফোন ব্যবহার রেটিনার মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ম্যাকুলার ডিজেনারেশান (গধপঁষধৎ উবমবহবৎধঃরড়হ) বলা হয়। ম্যাকুলার ডিজেনারেশানে আক্রান্ত ব্যক্তি তার চোখের দৃষ্টি অনেকটাই হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং এটি আস্তে আস্তে যে কাউকে চিরতরে অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে। স্মার্টফোনের নীল আলো সরাসরি আমাদের চোখে এসে পড়ায় এবং খুব কাছ থেকে এটি ব্যবহার করার ফলে চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

এক জরিপ অনুযায়ী ২০০০ মানুষের মাঝে ৫৫% স্বীকার করেছেন যে কিছুক্ষণ ফোন ব্যবহার করার পর তাদের চোখে তারা অস্বস্তি অনুভব করেন। এজন্য মহামূল্যবান চোখ রক্ষা করতে স্মার্টফোন ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন। অতিরিক্ত এটি ব্যবহার করবেন না এবং যতক্ষণ ব্যবহার করবেন ২০-২০-২০ রুল অনুসরণ করবেন। এর মানে হলো প্রতি ২০ মিনিট স্মার্টফোন ব্যবহারের পর ২০ সেকেন্ড ধরে ২০ ফুট দূরের কিছুর দিকে তাকাবেন এবং দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে এমন কিছু খাবার প্রতিদিনের খাবার মেনুতে রাখবেন।

১১। শ্রবণ শক্তির সমস্যা

স্মার্টফোনের খারাপ দিকের আরেকটি হলো শ্রবণ শক্তির সমস্যা। সাধারণত স্মার্টফোনে চ্যাট, ব্রাউজিং-এ আপনার কানের অর্থাৎ শ্রবণ শক্তির কোনো ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আপনি যদি বেশি পরিমাণে হেডফোন ব্যবহার করেন কথা বলা কিংবা গান শোনার জন্য তবে আপনার সাবধান হওয়ার সময় এসে গেছে।

আমাদের কানের ভেতর খুব ছোটো ছোটো পাতলা লোমের মতো থাকে। যার কাজ হলো বিভিন্ন নার্ভ এর মাধ্যমে মস্তিষ্কে রাসায়নিক সংকেত পাঠানো। হাই ভলিউমের শব্দ এই লোমগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হাই ভলিউম বলতে কেমন শব্দ বোঝানো হচ্ছে এখানে এই প্রশ্ন আসতে পারে।

উধহমবৎড়ঁং উবপরনবষং ঢ়ঁনষরপ যবধষঃয পধসঢ়ধরমহ এর মতে ৮৫ ডেসিবেল এর বেশি মাত্রার শব্দই হাই ভলিউম শব্দ যা আমাদের শ্রবণ শক্তির ক্ষতি করতে পারে। স্মার্টফোনে ব্যবহৃত হেডফোনে সর্বোচ্চ ১০৫ ডেসিবেল মাত্রার ভলিউম থাকে যা কনসার্টে উৎপন্ন শব্দের মতই। ৪ মিনিটের বেশি এই সর্বোচ্চ ভলিউমে কেউ গান শুনলে তা কানের তথা শ্রবণ শক্তির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এমন কি কেউ ভলিউম কমিয়ে ৯৪ ডেসিবেলও যদি করে তবুও টানা ১ ঘন্টার বেশি সেই শব্দ কানের ক্ষতি করতে পারে।

এছাড়াও স্মার্টফোনের খারাপ দিক আছে আরো। অনেক অনাকাক্সিক্ষত বিপদ ডেকে আনতে পারে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার। বিভিন্ন গাড়ি দুর্ঘটনা সহ, পারিবারিক-সামাজিক অশান্তি ডেকে আনতে পারে এর অতিরিক্ত ব্যবহার। অতিরিক্ত সবকিছুই আসলে কোনো না কোনোভাবে খারাপ কিছুই ডেকে আনে। তাই সাবধান হোন। প্রয়োজনের বেশি, দরকার ছাড়া স্মার্টফোনেরর ব্যবহার আস্তে আস্তে কমিয়ে আনুন। সময় থাকতেই স্মার্টফোনের খারাপ দিক সম্পর্কে নিজে সচেতন থাকুন। আশপাশের সবাইকে সচেতন করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here