স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

0
20


মুনির হাসান

রাঢুলীর জমিদারবাড়ির দোতলায় ঘুম ভাঙার পর ফুলু এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। কিছুক্ষণের মধ্যে অপেক্ষার অবসান হয় তার। শুনতে পায় একদল ছেলেমেয়ের কলকাকলি। বিছানা ত্যাগ করে নিচে নেমে আসে ফুলু। গিয়ে দাঁড়ায় সদর দরজার সামনে। তাদের বাড়ির সামনের পথ দিয়ে একদল ছেলেমেয়ে হই হই করতে স্কুলের পথে হেঁটে চলেছে। কলকাতায় যাওয়ার আগে ওদের সঙ্গেই স্কুলে যেত ফুলু, মাঠে খেলত। সুযোগ পেলে চলে যেত একটু দূরের কপোতাক্ষ নদে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আমাশয়ে আক্রান্ত দুর্বল ফুলুর পক্ষে পড়াশোনার চাপ নেওয়া সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য এখন যশোরের (এখন খুলনা) পাইকগাছা থানার রাঢুলী গ্রামের বাড়িতে থাকে সে।

মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই থাকে কলকাতায়। ছেলেমেয়েরা দৃষ্টির আড়াল হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ভেতর বাড়িতে ঢোকে। এখন তার কাজ হলো, দোতলায় কোনার ঘরে বাবার লাইব্রেরিতে চলে যাওয়া। এবার বাড়িতে এসে এই লাইব্রেরি হয়ে উঠেছে তার সময় কাটানোর আশ্রয়।


কয়েক দিন আগে সেখানে স্যার উইলিয়াম স্মিথের (Principia Latina)-এর খোঁজ পেয়েছে সে। কয়েক পাতা পড়েই বইটার অনেকখানি ‘বুঝিতে পারিয়াছে’ বলে মনে হয়েছে ফুলুর। তাই তার অদম্য ইচ্ছা হলো নিজে নিজে ল্যাটিন ভাষা আয়ত্ত করা। প্রচুর অধ্যবসায়ের সেটিই সে অর্জন করেছে। এরপরই সে জানতে পারে ফরাসি, ইতালিয়ান ও স্প্যানিশ Ñতিনটি ভাষাই এসেছে মূলত লাতিন থেকে। কাজেই লাতিন শিখতে পারলে বাকি তিনটি ভাষাও শেখা যাবে সহজেই। তাই ফুলু নিজে নিজেই লাতিন ভাষা আয়ত্ত করে ফেলল। সেই সঙ্গে পড়ে ফেলল ইংরেজি সাহিত্যের অনেক বই।

লেথব্রিজের Selection from modern English Literature, গোল্ডস্মিথের Vicar of Wakefield-সহ উইলিয়াম শেকসপিয়ারের জুলিয়াস সিজার, মার্চেন্ট অব ভেনিস ও হ্যামলেট পড়া হয়ে যায়। এ সময়ে ফুলুর বঙ্গদর্শন, সমাচার দর্পণ ইত্যাদি পত্রিকা পড়ার অভ্যাসও তৈরি হয়ে যায়। সে সময় বঙ্গদর্শন পত্রিকার প্রভাবে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত আর্যদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে জন স্টুয়ার্ট মিলের আত্মরচিত-এর অনুবাদ ছাপা হতো। এটি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে কিশোর ফুলুকে।

নিজের আত্মজীবনীতে ফুলুর উপলব্ধি, ‘একটি বিষয় আমি বিশেষভাবে লক্ষ করিলাম। জেমস মিল তাঁহার প্রতিভাশালী পুত্রকে কোনো সাধারণ স্কুলে পাঠান নাই এবং নিজেই তাহার বন্ধু ও শিক্ষক হইয়াছিলেন। অল্প বয়সে জন স্টুয়ার্ট মিলের বুদ্ধিবৃত্তির অসাধারণ বিকাশের ইহাই কারণ বলিয়া মনে করা যাইতে পারে। মাত্র দশ বছর বয়সে জন স্টুয়ার্ট মিল লাতিন ও গ্রিক ভাষা, পাটিগণিত, এবং ইংল্যাণ্ড, স্পেন ও রোমের ইতিহাস শিখিয়া ফেলিয়াছেন।’
শেক্সপিয়ার, এমারসন, কার্লাইল, ডিকেন্সের রচনা, নিউটন, গ্যালিলিও, ফ্রাঙ্কলিনের জীবনী, বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি ইচ্ছা খুশি বই পড়ার আনন্দ তার একাকী জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। স্যার উইলিয়াম জোনসের প্রশ্নের উত্তরে জোনসের মায়ের উক্তি ‘পড়িলেই সব জানিতে পারিবে’ কথাটি গভীরভাবে রেখাপাত করে কিশোর ফুলুর মনে।


জন্ম ও বাল্যকাল
১৮৬১ সাল বাঙালির জন্য একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বছর। সেই বছরে ৭ মে (২৫ বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে যে শিশুর জন্ম হয়, কালক্রমে সে হয়ে ওঠে বিশ্বকবি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এর মাত্র তিন মাসের মধ্যে কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে যশোরের পাইকগাছায় কপোতাক্ষ নদের পাড়ে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্ম আগস্টের ২ তারিখে। রবীন্দ্রনাথের হাতে যেমন বাংলার সাহিত্য অঙ্গনের নবযুগের সূচনা, তেমনি প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ও হয়ে উঠেছেন বাংলার বিজ্ঞান ও শিল্প উদ্যোগের পথিকৃৎ প্রধান পুরুষ। বলা যায়, তাঁদের দুজনের হাতেই বাংলার রেনেসাঁর সূচনা।


রাঢুলীর যে জমিদারবাড়িতে প্রফুল্ল চন্দ্রের জন্ম, সেটির পত্তন করেছিলেন তাঁর প্রপিতামহ মানিকলাল রায়। তিনি প্রথমে কৃষ্ণনগর ও পরে যশোরের কালেক্টরের দেওয়ান হন। ‘দেওয়ান’ শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন নিমক চৌকীর দেওয়ান। আর মানিকলাল রায়ের ক্ষেত্রে এটি ছিল ইংরেজদের রাজস্ব আদায়ের যে দপ্তর, সেখানকার দেশীয় সর্বোচ্চ পদ। মানিকলাল রায় যে প্রভূত ধন-সম্পত্তি অর্জন করেন, তদীয় পুত্র যশোরের সেরেস্তাদার আনন্দলাল রায় সেটিকে আরও বৃদ্ধি করেন। আনন্দলাল তাঁর পুত্র হরিশচন্দ্র রায়কে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় প্রেরণ করেন। তাঁহার সঙ্গী হন রাঢুলী গ্রামের উত্তর কপোতাক্ষ নদের পারের সাগদাঁড়ি গ্রামের দেওয়ান রাজনারায়ণ দত্ত ও তাঁর প্রথম পত্নী জাহ্নবী দেবীর একমাত্র সন্তান মধুসূদন দত্ত।

১৮৪৩ সলে মধুসূদন দত্ত খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ নাম গ্রহণ করেন। এ ঘটনা তাঁর সতীর্থদের পরিবারগুলোয় প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আনন্দলাল রায় দ্রুত তাঁর পুত্রকে রাঢুলীতে নিয়ে আসেন এবং ভুবনমোহিনী দেবীর সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে হরিশচন্দ্রকে সম্পত্তি দেখাশুনার ভার দেন। হরিশচন্দ্র মেধাবী এবং পারসি, সংস্কৃত ও আরবি ভাষা জানতেন। তিনি দ্রুত নিজ বাড়িতে একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। বালক প্রফুল্ল তাঁর কাছেই প্রথম ইয়াংয়ের Night Thoughts, ফ্রান্সিস বেকনের Nouvm Organum ইত্যাদি বইয়ের নাম শোনেন। তত্ত্ববোধিনী, সমাচার, দর্পণ, হিন্দু পত্রিকা, অমৃতবাজার পত্রিকা ইত্যাদির গ্রাহক ছিলেন। ডাকযোগে এগুলো কলকাতা থেকে রাঢুলীতে পৌঁছাত।

বিয়ের পর যখনই হরিশচন্দ্র কলকাতা যেতেন, তখনই তিনি তাঁর স্ত্রী ভুবনমোহিনী দেবীর জন্য পড়াশোনার ব্যবস্থা করতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বয়ং ভুবনমোহিনী দেবীকে বাংলা পাঠ শিক্ষা করতে সহায়তা করতেন। মায়ের হাতেই প্রফুল্ল চন্দ্রের শিক্ষায় হাতেখড়ি হয়। তারপর তিনি তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠা করা গ্রামের স্কুলে অন্য ভাইদের সঙ্গে ভর্তি হন। বাড়িতে যেহেতু পড়াশোনা এবং বইপত্রের বিশাল সম্ভার ছিল, তাই শুরু থেকেই প্রফুল্লদের পড়াশোনায় অনুরাগ হয়ে ওঠে। ১৮৭০ সালে হরিশচন্দ্র সন্তানদের পড়ালেখার ভালো বন্দোবস্ত করার জন্য কলকাতায় যাওয়ার সিন্ধান্ত নেন। সে বছর তিনি স্থায়ীভাবে পরিবার নিয়ে কলকাতার ১৩২ নম্বর আর্মহার্স্ট ষ্ট্রিটে ভাড়া বাড়িতে চলে আসেন। প্রফুল্ল চন্দ্র ভর্তি হন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। সেখানে কৃতিধন্য শিক্ষকদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু ১৮৭৪ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র যখন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন তাঁর গুরুতর রক্ত আমাশয় হয়। ফলে তাঁর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ইচ্ছেমতো পড়ার সুযোগ পান। তারপর স্বাস্থ্য উদ্ধারের আশায় প্রফুল্ল চন্দ্রকে রাঢুলী গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যার কথা আমরা শুরুতে জেনেছি। পরবর্তী সময়ে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় মনে করতেন, এই অসুস্থতা তাঁর জন্য আর্শীবাদস্বরূপ ছিল।


কলকাতায় শিক্ষাজীবন
১৮৭৬ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কলকাতায় ফিরে অ্যালবার্ট স্কুলে আবারও পড়াশোনা শুরু করেন। সেখান থেকে এন্ট্রাস পাস করে ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র চন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্টোপলিটন কলেজে। ইংরেজ ও বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়েও তিনি পেলেন সমান আগ্রহ। এ সময় তিনি পার্শ্ববর্তী প্রেসিডেন্সি কলেজেও ‘বাইরের ছাত্র’ হিসেবে অধ্যাপকদের বক্তৃতা শুনতে যেতেন।

সেখানেই তিনি প্রথম রসায়নে নিজের আগ্রহ টের পান। প্রেসিডেন্সি কলেজে সেখানকার রসায়নের অধ্যাপক (পরে স্যার) আলেকজান্ডার পেডলার ল্যাবরেটরি ছাড়া শ্রেণিকক্ষেও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখাতেন। কিন্তু এতে প্রফুল্ল চন্দ্রের মনের আশা পূরণ হতো না। কাজেই এক সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তাঁর বাড়িতে একটি ‘ল্যাবরেটরি’ স্থাপন করে সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা করতেন। একদিন অক্সিহাইড্রোজেন ব্লো-পাইপ নিয়ে কাজ করার সময় দুর্ঘটনা হলেও তাঁরা কেউ সেই দুর্ঘটনায় পড়েননি। এভাবে রসায়নের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তেই থাকে। কাজেই এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএসসি ক্লাসে ভতি হন।


রাঢুলীতে থাকার সময় ল্যাটিন ও ফরাসি ভাষা তাঁর আয়ত্ত হয়। কলেজপাঠ্য হিসেবে সংস্কৃত ভাষাও তিনি শিখে ফেলেন। এর মধ্যে তিনি জানতে পারেন, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিলেতে বৃত্তি নিয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। এই বৃত্তি পেতে হলে ল্যাটিন, গ্রিক অথবা সংস্কৃত, ফরাসী অথবা জার্মান ভাষা জানা আবশ্যক ছিল। যেহেতু এই ভাষা তিনি জানেন, তাই তিনি এই পরীক্ষায় অংশ নেবেন বলে মনস্থির করেন এবং গোপনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কারণ, তিনি জানতেন সফল না হলে ‘সহপাঠীরা তাকে এই জন্য উপহাস করিবে’। কিন্তু সে বছর মুম্বাই নগরীর জনৈক পার্সি ও প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিলেতে শিক্ষালাভের সুযোগ পেলেন।

মা-বাবার সম্মতি নিয়ে প্রফুল্ল চন্দ্র পি কে রায়ে কনিষ্ঠ সহোদর দ্বারকানাথ রায়ের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া নামের জাহাজে করে ৩৩ দিন পর ১৮৮২ সালের জানুয়ারি মাসে বিলেতে হাজির হলেন। জাহাজঘাট থেকে লন্ডনে পৌঁছালে সেখানে অবস্থানরত জগদীশচন্দ্র বসু (পরে আচার্য ও স্যার) ও সত্যরঞ্জন দাশ তাঁদের অভ্যর্থনা জানান ও থাকার ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকে প্রফুল্ল চন্দ্র চলে গেলেন তাঁর জন্য নির্ধারিত এডিনবার্গ কলেজে।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here