হযরত ফাতিমা (রা.): নেয়ামতের চিরপ্রবাহমান ঝর্ণা (পর্ব-০৩)

3
328

নারী ও শিশু ডেস্ক : মক্কার কাফেরদের অত্যাচার ও হুমকির মুখে বিশ্বনবি (সা.) মদীনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রাতের বেলা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে নিজের বিছানায় শুইয়ে রেখে মদীনার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করেন এবং কাফেররা হযরত রাসুল (সা.)-কে হত্যা করতে এসে তাঁর বিছানায় হযরত আলী (রা.)-কে দেখে তাজ্জব বনে যায়। এভাবে হযরত রাসুল (সা.)-কে হত্যার পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যায়। বিশ্বনবি মক্কা ত্যাগ করার আগে হযরত আলীকে বলে গিয়েছিলেন, হযরত ফাতেমা (রা.) বনি হাশেম গোত্রের একদল নারীকে নিয়ে তিনি যেন পরবর্তীতে মদীনায় চলে আসেন। হযরত আলী (রা.)-এ নির্দেশ পালন করেন এবং সবাইকে নিয়ে মদীনার নিকটবর্তী কুবা এলাকায় হযরত রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে মিলিত হন।

মদীনায় হযরত ফাতেমা (রা.)-এর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেখানে তাঁর জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। দ্বিতীয় হিজরিতে এই ঐশী বিয়ে সংঘটিত হয়। ওই বছর বদর যুদ্ধে মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ে মদীনায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায় এবং সেখানকার ইসলামী সমাজের ভিত্তি মজবুত হয়। এ সময় কিছু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হযরত ফাতেমা (রা.)-কে বিয়ে করার জন্য আল্লাহ্র রাসুল (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি এসব প্রস্তাবের কোনোটিই গ্রহণ করেননি। এই ব্যক্তিবর্গই একথা উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে, আল্লাহ্র রাসুল (সা.) চাচ্ছেন হযরত ফাতেমা (রা.)-কে হযরত আলী (রা.)-এর হাতে তুলে দিতে। এ কারণে তারাই হযরত আলীকে রাসুল (সা.)-এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে থাকেন।

এদিকে হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু লজ্জাবোধের কারণে বিষয়টি নিয়ে ইতস্তত। কিন্তু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের পীড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র রাসুলের কাছে গিয়ে হাজির হন। তিনি বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ্! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গীত হোক। আমি আপনার ঘরে বড় হয়েছি এবং এতদিন আপনার অনেক অনুগ্রহ আমি গ্রহণ করেছি। আপনি আমাকে আমার পিতা-মাতার চেয়ে বেশি স্নেহ করেছেন এবং আপনার মাধ্যমে আমি হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছি। এখন আমার সময় হয়েছে বিয়ে করে সংসার গঠন করার যাতে স্ত্রীর সঙ্গে নিজের দুঃখকষ্টগুলো ভাগাভাগি করে নিতে পারি। আপনি যদি আপনার কন্যা ফাতেমাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেন তাহলে সেটা হবে আমার প্রতি আপনার অনেক বড় অনুগ্রহ এবং আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।
হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু-এর প্রস্তাব শুনে আল্লাহ্র রাসুল অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন, তুমি প্রস্তাব নিয়ে আসার আগে আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমার হাতেই ফাতেমাকে তুলে দিতে। এরপর আল্লাহ্র রাসুল (সা.) মুহাজির ও আনসারদেরকে মসজিদে নববীতে ডেকে পাঠানোর জন্য আশেকে রাসুল হযরত বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দেন। সবাই মসজিদে এলে রাসুলে আকরাম (সা.) মিম্বরে উঠে হামদ ও সানা পাঠ করার পর বলেন, হে লোকসকল! আপনারা জেনে রাখুন আল্লাহ্ আমাকে আলীর সঙ্গে ফাতেমার বিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর হযরত রাসুল (সা.) নিজেই বিয়ের খুতবা পাঠ করেন। তখন উপস্থিত সবাই নবদম্পতির সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য আল্লাহ্র কাছে দু’হাত তুলে দোয়া করেন। এরপর আল্লাহ্র রাসুল ঘরে ফিরে আলী (রা.)-কে নিজের ডানপাশে এবং ফাতেমা (রা.)-কে বামপাশে বসান। এরপর আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করেন: হে আল্লাহ্! আপনি এই বিয়ে কবুল করে নিন এবং এদেরকে পুতপবিত্র বংশধর দান করুন।

এভাবে হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু ও হযরত ফাতেমা (রা.)-এর দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। কয়েকদিন পর বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.) নিজ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করেন: কেমন স্বামী পেয়েছ মা? মা ফাতেমা (রা.) জবাব দেন: আব্বাজান! আল্লাহ্ তায়ালা এ যুগের শ্রেষ্ঠ পুরুষকে আমার ভাগ্যে জুড়ে দিয়েছেন। দয়াল রাসুল (সা.) কন্যাকে বললেন: মা আমার, আমি এমন একজনের হাতে তোমাকে তুলে দিয়েছি যে সবার আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক দিয়ে যে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এরপর হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে ডেকে আল্লাহ্র রাসুল (সা.) বলেন: স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করবে। জেনে রেখো, ফাতেমা আমার কলিজার টুকরা। যে তাকে কষ্ট দেবে সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল এবং যে তাকে খুশি করল সে যেন আমাকেই খুশি করল।

হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু ও হযরত মা ফাতেমা জাহরার সমন্বয়ে যে সংসার গঠিত হয় সেখানে দুজনই ছিলেন সব ধরনের গোনাহ ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত। হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ এবং হযরত ফাতেমা জাহরা (রা.) ছিলেন ইসলামের দৃষ্টিতে একজন পরিপূর্ণ নারী। দুজনই জন্মের পর থেকে আল্লাহ্র রাসুলের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা অনুযায়ী লালিত-পালিত হয়েছেন।

তৃতীয় হিজরিতে মা ফাতেমার কোল জুড়ে আসে তাদের বড় সন্তান হযরত হাসান (রা.)। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ওই বছরই ওহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা.)-এর অন্তত ৭০ জন সাহাবি শহীদ হয়ে যান, যাদের অন্যতম ছিলেন বিশ্বনবির প্রাণপ্রিয় চাচা হযরত আমির হামজা (রা.)। ওহুদের যুদ্ধে আহত মুসলিম যোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন হযরত ফাতেমা জাহরা (রা.)। দুঃখজনকভাবে আল্লাহ্র রাসুল (সা.) নিজেও ওই যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন এবং হযরত মা ফাতেমা নিজ হাতে পিতার ক্ষত স্থান পরিস্কার করে ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
(চলবে)

3 COMMENTS

  1. প্রতিটা যুগেই আল্লাহ আর আল্লাহর রাসূল এক সাথে থেকেছেন,রাসূলকে ভালোবাসার কারনে হযরত আলি আঃ কে সম্মান দান করেছেন আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here