হযরত ফাতিমা (রা.) : নেয়ামতের চিরপ্রবাহমান ঝর্ণা (শেষ পর্ব)

2
218

নারী ও শিশু ডেস্ক : বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হযরত ফাতিমাতুজ জাহরাকে নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। আল্লাহ্র রাসুল যখনই কোনো সফরে যেতেন তখন সবশেষে হযরত ফাতিমার কাছ থেকে বিদায় নিতেন এবং সফর শেষে সবার আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন। হযরত ফাতিমা (রা.) নিছক সন্তান হওয়ার কারণে হযরত রাসুল (সা.)-এর কাছে এতটা মর্যাদা লাভ করেননি বরং ইমান ও আমলের দিক দিয়ে তিনি আল্লাহ্র দরবারে ছিলেন অনেক উঁচু মর্যাদার অধিকারী। এছাড়া আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সরাসরি হযরত রাসুল (সা.)-এর আহলে বাইত বা নবী পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসতে তাঁর উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা শুরার ২৩ নম্বর আয়াতের একাংশে বলা হয়েছে: “বলুন, আমি আমার (রিসালাতের) দাওয়াতের পরিবর্তে তোমাদের কাছে আত্মীয়স্বজনের (নিকটজনদের) প্রতি সৌহার্দ ছাড়া আর কিছু চাই না।”

আল্লাহ্ তায়ালা এই আয়াতে দেওয়া নির্দেশের উদ্দেশ্য পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে তিনি হযরত রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশে বলেছেন: আপনি বলুন আমি (আমার রিসালাতের বিনিময়ে) তোমাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় পরিচালিত করা ছাড়া তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না।” অর্থাৎ এই দুই আয়াতকে পাশাপাশি রাখলে যে বিষয়টি বোঝা গেল তা হচ্ছে, হযরত রাসুল (সা.)-এর আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার অর্থ আল্লাহর রাস্তায় অটল থাকা। এ কারণে একদিন আল্লাহ্র রাসুল (সা.) মা ফাতিমার হাত ধরে বলেন: ফাতিমা আমার কলিজার টুকরা। যে কেউ তাকে কষ্ট দেবে সে যেন আমাকে কষ্ট দিলো এবং যে আমাকে কষ্ট দিলো সে যেন আল্লাহ্কেই কষ্ট দিলো। হযরত রাসুল (সা.) আরেকদিন হযরত মা ফাতিমাকে উদ্দেশ করে বলেন: হে ফাতিমা, তোমার খুশিতে আল্লাহ্ খুশি এবং তোমার ক্রোধে আল্লাহ্ ক্ষুব্ধ হন।

আল্লাহ্র রাসুলের জীবনের আরেকটি ঘটনায় প্রমাণ হয় আহলে বাইতের প্রতি এই মহামানবের ভালোবাসা নিছক আবেগতাড়িত ছিল না বরং এর মধ্যে নিহিত ছিল মুসলমানদের বিশ্বাসগত ভিত্তি। একবার নাজরানের খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের সঙ্গে বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) সংলাপে বসেন। তিনি তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরও তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) তাদেরকে মুবাহেলার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের পক্ষ থেকে এবং আমি আমার পক্ষ থেকে আমাদের সন্তান ও নারীদের পাশাপাশি যাদেরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি তাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আবার একত্রিত হব। এরপর পরস্পরের প্রতি অভিশাপ দেবো এবং আল্লাহর কাছে চাইব তিনি যেন আমাদের মধ্যে যে পক্ষ মিথ্যাবাদী তার ওপর গজব নাজিল করেন। পরবর্তীতে মুবাহেলার দিন দেখা গেল আল্লাহর রাসুল তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনকে, নারীদের মধ্য থেকে হযরত ফাতিমাকে এবং পুরুষদের মধ্য থেকে হযরত আলীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। খিষ্টান পণ্ডিতরা এ দৃশ্য থেকে মুবাহেলায় অংশ না নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়ে। এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, হযরত ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি আল্লাহর রাসুলের ভালোবাসার ভিত্তি ছিল আল্লাহর নির্দেশ।

গাদিরে খোমে বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.) হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে ইমামত ও খেলাফতের দায়িত্ব দেওয়ার পর স্বামীর প্রতি হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বিশেষ দায়িত্ব অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তখন থেকে আলী (রা.)-কে শুধু স্বামী হিসেবে নয় বরং ইমাম ও নেতা হিসেবে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্য করেন। হযরত মা ফাতিমা (রা.) যেসব আলামত দেখতে পান তাতে নিজের দূরদর্শী ভাবনার মাধ্যমে এই আশঙ্কা করতে থাকেন যে, সব মুসলমান গাদিরে খোমে হযরত আলী (রা.)-এর হাতে বায়াত করার পরও আল্লাহর রাসুলের মৃত্যুর পর তারা চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে। তাঁর এ আশঙ্কা সত্যি হতে বেশিদিন সময় লাগেনি। বিদায় হজ ও গাদির থেকে ফেরার কিছুদিনের মধ্যে আল্লাহর রাসুল (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মহান আল্লাহ্র ডাকে সাড়া দিয়ে দারুল বাকায় তাশরিফ নেন।

হযরত রাসুল (সা.) ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে হযরত আলী (রা.), সালমান ফারসি (রা.), হযরত মিকদাদ (রা.) ও হযরত আবু যর (রা.)-এর মতো মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাহাবি ছাড়া বাকি সবাই রাসুল (সা.)-এর দেহ মোবারক ফেলে রেখে মুসলিম সমাজের জন্য খলিফা নির্বাচনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা গাদিরে খোমে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে ঘোষিত নির্দেশের কথা বেমালুম ভুলে যান।

এই দৃশ্য সহ্য করা হযরত ফাতিমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা সত্ত্বেও মোহাম্মদী ইসলামের এতবড় একটি নির্দেশ পালিত হচ্ছে না দেখে মুসলিম সমাজকে তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য বনি হাশিম গোত্রের নারীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি মসজিদে প্রবেশ করেন। তাঁর সামনে পর্দা টানিয়ে দেওয়া হয়। অশ্রুসজল চোখে তিনি বক্তৃতা দিতে থাকেন। হযরত মা ফাতিমা (রা.) বলেন: আল্লাহ্ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে রিসালাতের গুরুদায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। সে সময় মানুষ আইয়ামে জাহিলিয়্যাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মানুষ আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। কিন্তু রাসুলের বরকতময় উপস্থিতিতে সে অন্ধকার কেটে গিয়ে আলো ফুটে ওঠে এবং মানুষ আল্লাহ্কে চিনতে পারে। এরপর আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবকে নিজের কাছে নিয়ে যান।

একটু থেমে হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা বলতে থাকেন: হে লোকসকল! রাসুল (সা.)-এর নিজ হাতে আপনারা দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করেছেন এবং আল্লাহর নির্দেশ ও বিধিনিষেধ সম্পর্কে আপনাদের স্পষ্ট ধারণা আছে। আপনারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বস্ত থাকুন। বিশ্বনবির নিযুক্ত প্রকৃত খলিফা হচ্ছেন আলী। আল্লাহ্ আপনাদের কাছ থেকে তার আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন। আলীর আনুগত্য মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত পিতার প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং আহলে বাইতের প্রতি অবিচার ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কারণে হযরত মা ফাতিমা (রা.) মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জমাদিউস সানির ৩ তারিখ অথবা মতান্তরে রবিউস সানির ১৩ তারিখ ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। তখন হযরত রাসুল (সা.)-এর মৃত্যুর পর মাত্র ৭৫ বা ৯৫ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। বিশ্বনবির ওফাতের পর তাঁর আহলে বাইতের প্রতি এতটা কঠোর আচরণ করা হয় যে, হযরত ফাতিমা (রা.) স্বামী আলী (রা.)-কে অসিয়ত করে যান : স্বামী আমার! আমার মৃত্যুর পর আপনি রাতের অন্ধকারে আমাকে দাফন করবেন। আমি চাই না আমার প্রতি যারা অত্যাচার করেছে তারা আমার জানাজায় অংশগ্রহণ করুক।

মুসলিম জাতি নবি পরিবারের ওপর নির্যাতনের তথ্য যাতে জানতে না পারে সেজন্য মিথ্যা হাদিস তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, হযরত ফাতিমা (রা.) এতটাই পর্দানীশিন ছিলেন যে, কেউ তাঁর মৃতদেহের আকৃতি দেখুক সেটা তিনি চাননি। তাই তিনি রাতের অন্ধকারে সমাহিত করার অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু সত্য সম্পূর্ণ বিপরীত।

কম বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেও এত অল্প বয়সেই তিনি নিজেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন মমতাময়ী মা ও বিশ্বস্ত স্ত্রী। সাদাসিধে জীবনযাপন এবং একাগ্রচিত্তের ইবাদতে তাঁর জুড়ি ছিল না। চরম বিপদে হযরত জাহরার ধৈর্য ছিল অনুকরণীয়। সার্বিকভাবে আল্লাহ্ তায়ালা অনন্তকাল ধরে তাকে মানব জাতির জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here