হযরত মাসুমা (রহ.) : সত্যের আলোয় চিরউজ্জ্বল

0
229
হযরত ফাতিমা আল মাসুম (রাহঃ)-এর রওজা শরীফ ।

নারী ও শিশু ডেস্ক: হযরত মাসুমা (রহ.) ইসলামের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। মোহাম্মদী ইসলামের নুরানি ধারার সংরক্ষণ ও প্রচার প্রসারে এ মহীয়সী নারীর বুদ্ধিদৃপ্ত সংগ্রামী ভূমিকা তাঁকে শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন করেছে। বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের আলোকিত চরিত্র ও মানবীয় গুণাবলির শ্রেষ্ঠ আদর্শ।

বিশ্বনবি (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইত বা নিষ্পাপ বংশধারায় জন্ম নেওয়া ইমাম হযরত মুসা কাজেম (রহ.)-এর কন্যা ছিলেন হযরত মাসুমা (রহ.)। ইমাম হযরত রেজা (রহ.) ছিলেন তাঁর ভাই। তাঁর মূল নাম ছিল ফাতেমা এবং ‘মাসুমাহ্’ ছিল ভাই রেজা (রহ.)-এর দেওয়া উপাধি। হযরত মুসা কাজেম (রহ.)-এর সন্তানদের মধ্যে ইমাম রেজা (রহ.)-এর পর তিনিই ছিলেন সেই যুগের সবচেয়ে বেশি সম্মানিতা ও সবার শ্রদ্ধার পাত্র।

হযরত মাসুমা ছিলেন উন্নত নৈতিক গুণাবলির অধিকারিনী। ধৈর্য ও স্থিরতায় তিনি ছিলেন অসম্ভব দৃঢ় মনেবলের। তিনি ছিলেন একজন হাদিস বিশেষজ্ঞ। তাছাড়া জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অসাধারণ খ্যাতি। একদিন আহলে বাইতের প্রতি অনুরক্ত একদল লোক ফিকাহ্ এবং অন্যান্য কিছু বিষয়ে তাদের প্রশ্নের উত্তর জানার জন্যে মদীনায় ইমাম কাজেম (রহ.)-এর কাছে আসেন। কিন্তু তারা যখন ইমামের বাড়িতে এলেন তখন জানলেন যে, ইমাম সফরে গেছেন। নিরুপায় হয়ে তাঁরা তাঁদের প্রশ্নগুলো লিখিত আকারে ইমামের পরিবারের কারো কাছে দিলেন যাতে পরবর্তী সফরে এসে তাঁদের প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে পারেন।

কদিন পর বিদায় নেবার জন্যে তাঁরা ইমামের বাড়ির দরজায় যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন যে হযরত মাসুমা (রহ.) তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব তৈরি করে রেখেছেন। প্রশ্নের জবাব পেয়ে তাঁরা ভীষণ খুশি হলেন। ফেরার সময় ইমাম কাজেম (রহ.)-এর সাথে তাঁদের দেখা হয় এবং তারা ইমামকে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ইমাম মাসুমার লেখা জবাবগুলো দেখেন এবং সেগুলো একদম সঠিক বলে অনুমোদন করেন। নিজের মেয়ের ব্যাপারে তিনি তখন তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বললেন, তার বাবা তার জন্যে উৎসর্গিত হোক।

২০০ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা মামুনের পীড়াপীড়ি ও হুমকি ধমকির কারণে ইমাম রেজা (রহ.) বাধ্য হয়েছিলেন খোরাসানে যেতে। তিনি তাঁর পরিবারের কাউকে সঙ্গে না নিয়েই মারভের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। তাঁর সফরের এক বছর পর ভাই ইমাম রেজা (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করা এবং মুসলমানদের নেতা ও ইমামের ব্যাপারে তাঁর দায়-দায়িত্ব পালনের জন্যে মাসুমা (রহ.) ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। সে অনুযায়ী তিনিও মারভের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। এ সময় তাঁর সাথে তাঁর ভাই এবং আত্মীয় স্বজনদের অনেকেই ছিলেন। পথিমধ্যে যাঁরাই মাসুমা (রহ.)-এর কথা শুনেছে তারাই গভীর আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে এসেছে তাঁর সাথে দেখা করতে এবং তার বিচিত্র জ্ঞানের ভান্ডার থেকে সমৃদ্ধি অর্জন করতে।

জনগণের এরকম আগ্রহ আর ভালোবাসা দেখে তিনিও তাঁর দায়িত্ব পালন করার সুযোগ নেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বনী আব্বাসীয় শাসকদের প্রকৃত চেহারা জনগণের সামনে তুলে ধরেন এবং তাদের জুলুম নির্যাতন আর প্রতারক নীতির কথা ফাঁস করে দেন। এগুলো আব্বাসীয়দের ভয়-ভীতি প্রদর্শন আর জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদেই তিনি করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হযরত মাসুমা (রহ.) ভাই ইমাম রেজা (রহ.)-এর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে মারভ শহরে যাবার জন্যে যে সফর শুরু করেছিলেন, সেই সফর শেষ হয়নি। তাঁদের কাফেলা যখন সভে শহরে গিয়ে পৌঁছে তখন বলদর্পী শাসক গোষ্ঠির অনেকেরই রোষানলে পড়ে যান তাঁরা। শাসক বাহিনী মাসুমা (রহ.)-এর পথরোধ করে দাঁড়ায় এমনকি তাঁর নিকটজনদের অনেককেই শহিদ করে। মাসুমা (রহ.)ও এই সফরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে তাঁর পক্ষে আর মারভের পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। তখন তাঁর সঙ্গীদের বললেন, তাঁকে যেন কোমে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, আমাকে কোম শহরে নিয়ে যাও। কেননা, আমার বাবার কাছে শুনেছি যে, তিনি বলেছিলেন এই শহরটি নবিজীর আহলে বাইতের প্রতি অনুরাগীদের কেন্দ্র। সে কারণেই তাঁকে কোম শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।

হযরত মাসুমা (রহ.) ২০১ হিজরিতে পারস্যের (বর্তমানে ইরানের) কোম শহরে আসেন। তিনি কোম শহরে যান এবং এখানেই ইন্তেকাল করেন। তিনি শৈশবেই ধর্ম ও ধর্মীয় আইন সম্পর্কে মানুষের নানা প্রশ্নের জবাব দিতেন। সে যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশও তাঁর ব্যক্তিত্বের বিকাশে সহায়ক হয়েছে। হযরত মাসুমা (রহ.)-এর যুগে আব্বাসীয় শাসকরা জুলুম, নির্যাতন ও ত্রাসের এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। ইমাম রেজা (রহ.) ও তাঁর বোন হযরত মাসুমা (রহ.) আব্বাসীয় শাসকদের চরিত্র ও নীতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। আব্বাসীয় শাসকের নির্দেশে হযরত মুসা কাজেম (রহ.)-কে শহিদ করা হয়েছিল। তৎকালীন শাসকদের হাতে জনগণের প্রতারিত হওয়ার পরিণাম কি হতে পারে সে সম্পর্কেও ইমাম রেজা (রহ.) ও তাঁর বোন ধারণা রাখতেন। ইমাম পরিবারের সদস্য হিসেবে জুলুম ও অত্যাচারের মোকাবিলায় প্রতিরোধের শিক্ষাও রপ্ত করেছিলেন হযরত মাসুমা (রহ.)। তাই তিনি দূরদর্শিতা নিয়ে সত্যকে সংরক্ষণের পথেই অগ্রসর হন।

খলিফা মামুন হযরত ইমাম রেজা (রহ.)-কে যুবরাজ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলে এর জবাবে তিনি যে প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর দিয়ে মামুনের দূরভিসন্ধি বা জনমতকে ধোকা দেওয়ার উদ্যোগ সবার কাছে স্পষ্ট করেছিলেন হযরত মাসুমা (সা.) তা বারবার সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতেন। ইমাম মামুনকে বলেছিলেন, “খেলাফত যদি তোমার অধিকার হয়ে থাকে, তাহলে তা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা উচিত নয়, আর এটা যদি তোমার অধিকার না হয়ে থাকে তাহলে কেন নিজে খলিফার পথে বসেছো এবং যুবরাজ নির্বাচন করছো?”
এভাবে তিনি বিশ্বনবি (সা.)-এর আহলে বাইতই যে মুসলমানদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক নেতৃত্বের প্রকৃত হকদার বা যোগ্য ব্যক্তিত্ব তা মুসলমানদের কাছে তুলে ধরেছিলেন। অসুস্থ হযরত মাসুমা (রহ.) কোমে আসার পর মাত্র ১৭ দিন বেঁচেছিলেন। কিন্তু এ অল্প কয়েক দিনেই তিনি কোমে রেখে গেছেন বরকত ও কল্যাণের অফুরন্ত রত্নমালা। তাঁরই মাজারের পাশে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম সেরা ও বৃহৎ ধর্মীয় শিক্ষালয়। দয়াল রাসুল (সা.)-এর লাখো ভক্ত-অনুরক্তরা প্রতিবছর হযরত মাসুমা (রহ.)-এর মাজারে ছুটে যান আত্মিক প্রশান্তি ও রহমত-বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here