হযরত মুসা (আ.) ও হযরত খিজির (আ.)-এর ঘটনা

12
834

মহান আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছেন যাঁদের শিক্ষক জাগতিক কোনো উপায় উপকরণ কিংবা কোনো মানুষ নয়। তাঁদের শিক্ষক মহান আল্লাহ্ নিজেই। আর তাঁরা হলেন- নবি, রাসুল ও আওলিয়ায়ে কেরাম। আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে তাঁরা বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। হযরত খিজির (আ.) ছিলেন এমনই এক ব্যক্তি, যাঁকে মহান আল্লাহ্ সৃষ্টিজগতের ভেদ ও রহস্যের জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন। খিজির (আ.)-এর প্রকৃত নাম বালআ ইবনে মালকান। খিজির হলো তাঁর উপাধি। আল্লাহর রাসুল (সা.) ফরমান- “খিজির (আ.)-কে খিজির নামে আখ্যায়িত করার সূত্র ছিল এই যে, তিনি একদিন ঘাস পাতাবিহীন এক স্থানে বসেছিলেন, হঠাৎ ঐ স্থানটি সবুজ টাটকা ঘাসে আচ্ছাদিত হয়ে গেলো।” (বোখারী শরীফের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৫০৭)

হযরত মুসা (আ.) ও হযরত খিজির (আ.)-এর ঘটনা ইতিহাসে এলমে মারেফাতের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কেননা হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল হওয়া সত্ত্বেও এলমে মারেফাতের শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি হযরত খিজির (আ.)-এর নিকট গমন করেন এবং তাঁকে তাঁর খেদমতে কিছুদিন রাখার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ এ ঘটনাটি পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে এখানে উল্লেখ করা হলো।

হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) হতে বর্র্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘একদিন হযরত মুসা (আ.) বনি ইসরাঈলের এক সভায় বক্তব্য রাখছিলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, বর্তমান যুগে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি কে? হযরত মুসা (আ.) বললেন- আমি। এরূপ জবাব আল্লাহ্ তায়ালার পছন্দ হলো না। তাই তিনি মুসা (আ.)-কে তিরস্কার করলেন। কেননা হযরত মুসা (আ.) বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেননি। আল্লাহ্ তায়ালা হযরত মুসা (আ.)-কে ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, দুসমুদ্রের মিলন স্থলে অবস্থানকারী আমার এক বান্দা আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। একথা শুনে হযরত মুসা (আ.) প্রার্থনা করলেন- হে আমার প্রতিপালক! তাঁর কাছে আমি যাবো কীভাবে? আল্লাহ্ বললেন- থলের মধ্যে একটি ভাজা (শোল) মাছ নিয়ে নিন এবং দুসমুদ্রের মিলন স্থলের উদ্দেশে রওনা করুন। যেখানে পৌঁছানোর পর (শোল) মাছটি হারিয়ে যাবে, সেখানেই আমার এই বান্দার সাক্ষাৎ পাবেন।

হযরত মুসা (আ.) থলের মধ্যে একটি ভাজা (শোল) মাছ নিয়ে রওনা করলেন। তাঁর সাথে তাঁর খাদেম ইউশা ইবনে নুনও ছিল। পথিমধ্যে একটি পাথর খণ্ডের নিকট তাঁরা যাত্রা বিরতি করলেন। হযরত মুসা (আ.) পাথরটির উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেলেন। এখানে হঠাৎ মাছটি নড়াচড়া করতে লাগল এবং থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেলো। ইউশা ইবনে নুন বিস্ময়কর এই ঘটনা দেখছিলেন। আর হযরত মুসা (আ.) ঘুমিয়ে ছিলেন। যখন জাগ্রত হলেন, তখন ইউশা ইবনে নুন এই বিস্ময়কর ঘটনা হযরত মুসা (আ.)-কে বলতে ভুলে গেলেন এবং তাঁরা সেখান থেকে সামনে রওনা হয়ে পূর্ণ একদিন এক রাত চলার পর, সকাল বেলায় হযরত মুসা (আ.) তাঁর খাদেমকে বললেন- ‘আমাদের নাশতা আন। এই সফরে যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’ হযরত রাসুল (সা.) বলেন-দুসমুদ্রের মিলনস্থল অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত হযরত মুসা (আ.)-এর ক্লান্তি অনুভব হয়নি। নাশতা চাওয়ার পর তাঁর খাদেম ইউশা ইবনে নুন বললেন- ‘আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন পাথর খণ্ডে বিশ্রাম নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছটির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। শয়তানই আমাকে এ কথা স্মরণ রাখতে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি বিস্ময়করভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিয়েছে (তখন হযরত মুসা (আ.) বললেন-সে স্থানটিই তো আমাদের গন্তব্যস্থল ছিল)।’

আর তখনই তাঁরা ফিরে চললেন এবং স্থানটি পাওয়ার জন্য পূর্বের পথ ধরেই চললেন। পূর্বের স্থানে পৌঁছে তাঁরা দেখতে পেলেন যে, মাছটি সমুদ্রের যে পথ দিয়ে চলে গেছে, সেখানে একটি সুড়ঙ্গের মতো হয়ে গেছে। এই ঘটনাটি খাদেম ইউশা ইবনে নুনের জন্য ছিল বিস্ময়কর এবং মাছটির জন্য ছিল একটি সুড়ঙ্গ মাত্র। আর পাথর খণ্ডের নিকট পৌঁছে দেখলেন, এক ব্যক্তি আপাদমস্তক চাদরে আবৃত হয়ে শুয়ে আছেন। মুসা (আ.) সেই অবস্থায়ই সালাম দিলে, হররত খিজির (আ.) বললেন- এই (জনমানবহীন) প্রান্তরে সালাম কোথা থেকে আসলো? হযরত মুসা (আ.) বললেন- আমি মুসা। হযরত খিজির (আ.) জানতে চাইলেন, বনি ইসরাঈলের মুসা? তিনি জবাব দিলেন- হ্যাঁ, আমি বনি ইসরাঈলের মুসা। হযরত মুসা (আ.) তাঁকে বললেন- ‘আমি কি এই শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে, সেই থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন? হযরত খিজির (আ.) বললেন- হে মুসা (আ.)! আল্লাহ্ তায়ালা আপনাকে এমন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, যা আমি জানি না; অন্যদিকে আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে এমন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানেন না। হযরত মুসা (আ.) বললেন- আমি আপনার সাথে থাকব। হযরত খিজির (আ.) বললেন- ‘যদি আপনি আমার সাথে থাকতেই চান, তবে কোনো বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি নিজেই সে বিষয়টি বলে দেই।’ এ কথা বলার পর উভয়ে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে লাগলেন। ঘটনাক্রমে তাদের সামনে একটি নৌকা উপস্থিত হলো। মাঝিরা হযরত খিজির (আ.)-কে চিনে ফেলল এবং কোনো রকম পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদেরকে নৌকায় তুলে নিল। হযরত রাসুল (সা.) বলেন- ইতিমধ্যে একটি পাখি এসে নৌকার এক প্রান্তে বসল এবং সমুদ্র থেকে এক ঠোঁট পানি তুলে নিলো। হযরত খিজির (আ.) হযরত মুসা (আ.)-কে বললেন-আমার জ্ঞান, আপনার জ্ঞান, এবং পুরো সৃষ্টি জীবের জ্ঞান মিলে আল্লাহ্ তায়ালার জ্ঞানের মোকাবিলায় এমন তুলনাও হয় না, যেমনটি এ পাখির ঠোঁটের পানির সাথে রয়েছে সমুদ্রের পানি। নৌকায় চড়েই হযরত খিজির (আ.) কুড়ালের সাহায্যে নৌকার একটি তক্তা তুলে ফেললেন। এতে হযরত মুসা (আ.) স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি হযরত খিজির (আ.)-কে বললেন-তারা কোনো প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই আমাদেরকে নৌকায় তুলে নিয়েছে। আর আপনি কিনা এ প্রতিদানে তাদের নৌকা ভেঙে দিলেন, যেন সবাই ডুবে যায়? এতে আপনি অতি মন্দ কাজ করলেন। খিজির (আ.) বললেন- আমি কি বলিনি আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। মুসা (আ.) বললেন- আমার বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করবেন না।

অতঃপর তাঁরা নৌকা থেকে নেমে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে লাগলেন। হঠাৎ খিজির (আ.) একটি বালককে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করতে দেখলেন। হযরত খিজির (আ.) স্বহস্তে বালকটির দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। বালকটি মরে গেলো। হযরত মুসা (আ.) বললেন- ‘আপনি একটি নিষ্পাপ প্রাণকে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন। এ যে বিরাট গুনাহর কাজ করলেন।’ হযরত খিজির (আ.) বললেন- আমি তো পূর্বেই বলেছিলাম, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। হযরত মুসা (আ.) বললেন- এরপর যদি আমি আপনাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমাকে আপনার সাথে রাখবেন না। আপনি আমার পক্ষ থেকে অভিযোগ মুক্ত হয়ে যাবেন ।

অতঃপর তারা চলতে লাগলেন। অবশেষে যখন একটি গ্রামের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছে, তাদের নিকট খাবার চাইলেন, তখন তারা খাবার দিতে সরাসরি অস্বীকার করল। হযরত খিজির (আ.) এই গ্রামে একটি দেয়ালকে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম দেখতে পেলেন। তিনি নিজ হাতে দেয়ালটি সোজা করে দিলেন। হযরত মুসা (আ.) তাঁকে বললেন- আমরা এই গ্রামে প্রবেশ করেছিলাম। অতঃপর তারা আমাদের আতিথেয়তা করেনি এবং আমাদেরকে খাদ্য পরিবেশন করেনি, অথচ আপনি তাদের এত বড় কাজ করে দিলেন; ইচ্ছা করলে এর পারিশ্রমিক তাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারতেন।

হযরত খিজির (আ.) বললেন- হাযা ফিরাকু বাইনী ওয়া বাইনিকা অর্থাৎ- ‘এখন শর্ত পূর্ণ হয়ে গেছে। এটিই আমার ও আপনার মধ্যে বিচ্ছেদের সময়।’ এখন যে বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি, আমি সেগুলোর তাৎপর্য বলে দিচ্ছি। আর সে তাৎপর্য মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে- ‘হযরত খিজির (আ.) বললেন- হে মুসা (আ.)! সর্বপ্রথম নৌকাটির বিষয় ধরুন, সেটি ছিলো কতিপয় দরিদ্র লোকের। তারা সাগরে জীবিকা অন্বেষণ করতো। আমি নৌকাটি (তক্তা উঠিয়ে) খুঁত বিশিষ্ট করে দিয়েছি, কেননা তাদের সামনে ছিল এক রাজা, যে (রাজা নির্দেশ জারি করেছিল যে, রাজ্যের সকল নতুন নৌকা রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে আসা হোক, ফলে রাজার লোকেরা) সব নিখুঁত নৌকা বল প্রয়োগ করে ছিনিয়ে নিয়ে যেতো। আর বালকটির বিষয়ে ছিলো এরূপ যে, তার পিতামাতা ছিল মু’মিন (অথচ বালকটি ছিলো কাফির)। আল্লাহ্ প্রদত্ত এলেম দ্বারা জানতে পেরে), আমি আশঙ্কা করলাম সে অবাধ্যতা এবং কুফুরি দ্বারা পিতামাতাকে ভীষণ কষ্ট দেবে (অতঃপর আমি এরূপ করি যে, বালকটিকে হত্যা করে ফেলি)। তারপর আমি চাইলাম তাদের রব তাদেরকে এর বদলে এমন এক সন্তান দান করবেন, যে হবে পবিত্র, মহৎ ও ভালোবাসায় পিতামাতার অধিকতর ঘনিষ্ঠ (অতঃপর মহান আল্লাহ্ ঐ পিতা মাতাকে আবেদা, সালেহা ও চক্ষুশীতল কারিণী এক কন্যা সন্তান দান করেন)। আর (ভেঙ্গে পড়া) দেয়ালের ব্যাপারটি ছিলো এরূপ-এটির মালিকানা ছিল দুএতিম বালকের এবং এর নিচে ছিল তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা পৈতৃক কিছু ধন সম্পদ; আর তাদের পিতা ছিলেন একজন নেককার লোক। [অতএব হে মুসা (আ.)!] আপনার রব দয়াপরবশ হলেন এবং ইচ্ছা করলেন যে, এতিম বালকদ্বয় যৌবনে উপনীত হবে এবং (স্বপ্নে দেখা) নিজেদের ধনভাণ্ডার সুরক্ষিত অবস্থায় বের করে নেবে (আর এ কারণেই আমি কাত হয়ে পড়ে যাওয়া দেয়ালটি সোজা করে মেরামত করে দিয়েছি)। [হে মুসা (আ.)!] আমি এসবের কিছুই নিজ থেকে করিনি (বরং এ সবকিছুই আমি আল্লাহর ইচ্ছায় দিব্যজ্ঞানে করেছি)। হে মুসা (আ.)! আপনি যে বিষয়ে ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, এ হলো তার প্রকৃত রহস্য বা তত্ত্ব কথা।’এভাবেই আল্লাহর রাসুল (সা.) সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করেন। অতঃপর তিনি এরশাদ করেন- আমার ইচ্ছা হচ্ছিল যে, যদি হযরত মুসা (আ.) আরো কিছু সময় ধৈর্যধারণ করতে পারতেন, তাহলে আমরা আল্লাহ্ তায়ালার সৃষ্টি রহস্যের আরো কিছু নিগূঢ় তত্ত্ব জানতে পারতাম।’’ (সূরা আল কাহ্ফ ১৮ : আয়াত ৭৯ থেকে ৮২; এবং বোখারী শরীফ-২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৯০)

হযরত খিজির (আ.)-এর কাছ থেকে হযরত মুসা (আ.)-এর এলমে মারেফাতের জ্ঞান শিক্ষা লাভের এ ঘটনায় মোর্শেদ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও মোর্শেদের আদেশ কিভাবে মান্য করতে হয় এবং তাঁর আদেশ বিনা প্রতিবাদে পালন করার প্রমাণ পাওয়া যায়।

[সূত্র : তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২১ এবং ফেরকা সমস্যার সমাধান গ্রন্থ থেকে সংকলিত, পৃষ্ঠা ৭৩-৭৭]

12 COMMENTS

  1. আলহামদুলিল্লাহ এলমে মারেফাতের জ্ঞানের সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম এই পোস্টের মাধ্যমে এবং মোর্শেদ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এবং মোর্শেদের আদেশ কিভাবে মান্য করতে তাও জানতে পারলাম। শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি মহান মালিকের পবিত্র কদম মোবারকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here