হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রকৃত পরিচয়

0
595

পথভোলা মানুষকে তাওয়াজ্জোহ প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করার জন্য যুগে যুগে নবি-রাসুলগণ প্রেরিত হয়েছেন। দেহাকৃতিতে তাঁরা সমাজের অন্য সকল মানুষের মতো হলেও আত্মিকভাবে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপন পবিত্র আত্মা থেকে অন্যের কলুষিত আত্মাকে তাওয়াজ্জোহ প্রদানের মাধ্যমে, তাঁরা মানুষকে হিদায়েত করতে সমর্থ ছিল। মহান আল্লাহ বলেন- “হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আপনি বলুন, আমি তো তোমাদেরই মতো মানবকোলে তশরিফ গ্রহণ করেছি। আর আমার প্রতি অহি প্রেরিত হয় যে, তোমাদের উপাস্য তো এক উপাস্য আল্লাহ।” (সূরা আল কাহফ ১৮: আয়াত ১১০)


সেই সাথে অশেষ দয়াময় আল্লাহ্ অন্য আয়াতে এরশাদ করেন- “সকল মানুষ একই উম্মত ছিলো। তারপর আল্লাহ নবিদের পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর তাঁদের সাথে সত্যসহ কিতাব নাজিল করলেন। যেন মানুষের মাঝে যে বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটির মীমাংসা করতে পারেন।” (সূরা আল বাকারাহ ২: আয়াত ২১৩)


মহাকালের অবিরাম যাত্রায় আম্বিয়ায়ে কেরামের এ ধারাকে অব্যাহত রেখে সর্বশ্রেষ্ঠ নবি হিসেবে সর্বশেষে প্রেরিত হয়েছে- হযরত রাসুল (সা.)। তিনি আল্লাহর নুর হতে সৃষ্ট এবং তাঁর নুর হতে সমগ্র জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন- “আল্লাহর নিকট থেকে এক নুর ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে।” (সূরা-আল মায়িদাহ ৫: আয়াত ১৫)


অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে- “হে রাসুল (সা.)! আমি তো আপনাকে জগৎসমূহের প্রতি কেবল রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল আম্বিয়া ২১: আয়াত ১০৭)


সেই সাথে সুমহান আল্লাহ অহির বাণী আল কুরআনের অন্য আয়াতে এরশাদ করেন- “হে নবি (সা.)! নিশ্চয় আমি তো আপনাকে প্রেরণ করেছি (সকল মানুষের কর্মের) সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতারূপে ও সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহ্র আদেশে তাঁর দিকে আহ্বানকারীরূপে ও প্রজ্বলিত প্রদীপরূপে।” (সূরা আল আহযাব ৩৩: আয়াত ৪৫ ও ৪৬)


সুতরাং মহান রাব্বুল আলামিনের বাণী মোবারকে বিষটি সুস্পষ্ট, হযরত রাসুল (সা.) হলে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত এবং হিদায়েতের নুরের জ্বলন্ত প্রদীপ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর গুণের ধারকরূপে ‘নুরে মোহাম্মদী’কে সৃষ্টি করেছেন।


নুরে মোহাম্মদীর ধারক হিসেবে অন্যান্য নবি-রাসুলগণের আবির্ভাব হয়েছে এবং তাঁদের স্ব স্ব আত্মার অবস্থানুযায়ী ‘নুরে মোহাম্মদীর’ গুণাবলি একে একে প্রকাশ পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “মহিমান্বিত আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নুর সৃষ্টি করেন।” (তাফসীরে রূহুল বয়ান ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭০)


অনুরূপভাবে আল্লাহ্র রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “আমি আদম (আ.)-এর সৃষ্টির চৌদ্দ হাজার বছর পূর্ব হতে আমার প্রতিপালক আল্লাহর সম্মুখে নুর হিসেবে অবস্থান করছিলাম। তখন সেই নুর আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করত, আর ফেরেশতাগণও তাঁর সাথে তাসবিহ পাঠ করত। অতঃপর যখন আল্লাহ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন, তখন তিনি আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে আমার সেই নুর প্রবিষ্ট করেন।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭০)


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে আরো বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “যখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন, তখন আমাকে তাঁর পৃষ্ঠদেশে স্থাপন করে জমিনে প্রেরণ করেন। আমি হযরত নুহ (আ.)-এর কিস্তিতে হযরত নুহ (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে ছিলাম। আর আল্লাহ আমাকে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে স্থাপন করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাকে একের পর এক সম্মানিত ব্যক্তিগণের পৃষ্ঠদেশ এবং পবিত্র মায়েদের রেহেমের (গর্ভাশয়ের) মাধ্যমে জগতের বুকে প্রেরণ করতে থাকেন। সর্বশেষ আমাকে তিনি আমার বর্তমান পিতামাতার মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭০)


সর্বগুণে প্রকাশিত হযরত রাসুল (সা.)-এর আগমন সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নানাভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। অহির কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জিলের কল্যাণে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা পূর্বেই হযরত রাসুল (সা.)-এর শুভাগমনের সংবাদ পেয়েছিল। সুমহান আল্লাহ বলেন- “যারা অনুসরণ করে এমন রাসুলের, যিনি নিরক্ষর নবি (অর্থাৎ কালির অক্ষরে লিপিবদ্ধ পুস্তকনির্ভর জ্ঞান থেকে পবিত্র নবি), যাঁকে তারা লিখিত পায় নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলের মধ্যে।” (সূরা আল আ‘রাফ ৭: আয়াত ১৫৭)


প্রকৃতপক্ষে সর্বশেষে হযরত রাসুল (সা.)-কে প্রেরণ করে আল্লাহ তায়ালা তাঁর মাঝে ‘নূরে মোহাম্মদী’র সর্বগুণ বিকশিত করেছেন। এজন্যই হযরত রাসুল (সা.)-এর পরে আর কোন নবি আসবে না। কেননা হযরত রাসুল (সা.) হলেন হায়াতুন নবি। অর্থাৎ তিনি জাহেরিভাবে পর্দা করার পরেও ‘নূরে মোহাম্মদী’র অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে সর্বকালে বিরাজমান থাকবে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “আমি আদম সন্তানদের প্রত্যেক যুগের উত্তম শ্রেণীতে যুগের পর যুগ প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর ঐ যুগে প্রেরিত হয়েছি, যে যুগে আমি বর্তমান আছি।” (বোখারী শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ৫০২ ও ৫০৩, হাদিস নম্বর ৩৪৩২: তাফসীরে মাজহারী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ১৩৫ ও ১৩৬; মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা নম্বর ৫১১; মুসনাদে আহমাদ ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ১৯৬, হাদিস নম্বর ৯৩৬০)


নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে এ হাদিসের দৃষ্টান্ত উপলব্ধি করা যায়- যুগের ইমাম, মোজাদ্দেদ ও আওলিয়ায়ে কেরামের সহবত লাভ করার মধ্য দিয়ে। কেননা অলী-আল্লাহ্গণ ‘নূরে মোহাম্মদী’ আপন সিনায় ধারণ করেন, আর তাঁদের মাধ্যমেই হযরত রাসুল (সা.)-এর হিদায়েতের ধারা অব্যাহত আছে এবং থাকবে।


নবুয়তের যুগে যখন যে নবি হিদায়েতের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, মুক্তিকামী মানুষকে তাঁর আনুগত্য স্বীকার এবং তাঁর দেওয়া বিধান অনুসরণের মাধ্যমে মুসলমান হতে হয়েছে। বেলায়েতের যুগে তেমনি ‘নুরে মোহাম্মদী’র ধারক অলী-আল্লাহগণের আনুগত্য স্বীকার করেই, তাঁদের দেওয়া পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে একজন মানুষকে খাঁটি মুসলমান হতে হয়। সুতরাং হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে- তিনি হলেন সৃষ্টির মূল। তিনি নুরে মোহাম্মদীরূপে হযরত আদম (আ.)-এর ক্বালবে বিরাজিত থেকে আদম সন্তান তথা মানবজাতিকে হিদায়েতের পথপ্রদর্শন শুরু করেন। অতঃপর নবুয়তের যুগ ও নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগ তথা সর্বযুগেই তিনি আম্বিয়ায়ে কেরাম ও আওলিয়ায়ে কেরামের পৃষ্ঠদেশে বিরাজিত থেকে হিদায়েতের কাজ অব্যাহত রেখে চলেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here