হাফিজের কাব্যে পবিত্র কুরআনের প্রতিফলন

0
56

অধ্যাপক ড. মো. মুহসীন উদ্দীন মিয়া
পূর্ব প্রকাশিতের পর

পবিত্র কুরআনের ছন্দরীতি অনুসরণ: সাধারণত ছন্দবদ্ধ কবিতার অন্ত্যমিলকে উচ্চারণের সুবিধার্থে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে পড়ার নিয়ম-নীতিকে সাহিত্যের পরিভাষায় বাহার বলে যা ‘এলমে আরুয’ নামে পরিচিত। ফারসি ছন্দ বিশারদগণের মতে পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহে এই ছন্দরীতি বিদ্যমান রয়েছে। বলা যায়, পবিত্র কুরআনের সেই ছন্দ ও শব্দ ব্যঞ্জনা থেকেই এই অলংকারশাস্ত্রের উৎপত্তি। ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে প্রচলিত সেই বাহার ছন্দরীতিগুলো হলো রামাল, মোযারে, হাযায, মোতাকারের প্রভৃতি। হাফিজ কুরআনের সেই অনিন্দ্যসুন্দর ছন্দরীতি অবলম্বন করেই তাঁর কবিতার কাঠামো নির্মাণ করেছেন।


যেমন বাহারে রামাল: এ ওজনটি পবিত্র কুরআনের যে আয়াতগুচ্ছ থেকে নেওয়া হয়েছে তার একটি হচ্ছে অতঃপর যখন তোমরা নামায সম্পন্ন করো, তখন দন্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো।) (অনুবাদ: মারেফুল কুরআন)
এ ওজনে রচিত হাফিজের কবিতা-
[হাফেজ : ১৩৮৬ : ১১৬]


হৃদয়হারী প্রিয়া যদি করতে থাকে ছলচাতুরী
ক্ষণকালেই যাহেদগণের ফুটো হবে ইমান তরী।
হাফিজের সবচাইতে প্রিয় ছন্দরীতিও এটি। তাঁর ৪৯৫টি গজলের ১৮০টিই এ রীতিতে রচিত। (সিরাজ: ১৩৬৮ : ৫৭) (জাহরা জামশিদী)


বাহারে হাযায:
কুরআনের আয়াত: (অতএব, তোমাদের কোন অপকৌশল থাকলে তা প্রয়োগ করো আমার কাছে।) অনুবাদ : মারেফুল কুরআন
এ ওজনে হাফিজের কবিতা:
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল ঢেউয়ে আঁধার রাতে মাঝ সমুদ্রে থাকা
আমাদের অবস্থা তারা কিভাবে বুঝবে, যারা সমুদ্রতটে নিরাপদে অবস্থান করছে। [হাফিজ : ১৩৮৬ : ১]
বাহারে মোতাকারেব :
পবিত্র কুরআনের বাণী : (নামাজ প্রতিষ্ঠা করো এবং যাকাত আদায় করো)
হাফিজের কবিতা:
(হাফিজ : ১৩৮৬; ২৯৪)
প্রিয় পরিচিত সেই সুগন্ধকে সালাম
যাতে মানুষ আলোর সন্ধান পায়। (জামশিদী : ১৩৯৯ : ৪৫, ৪৬, ৪৭)
পবিত্র কুরআনের আয়াত ও বিষয় অবতারণার পদ্ধতি অনুসরণ: তাঁর গযল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তিনি কবিতার চরণ বা শ্লোক উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও পবিত্র কুরআনের বর্ণনারীতির অনুকরণ করেছেন। আমরা পবিত্র কুরআনের কোনো সূরা বা অধ্যায় পড়ার সময় দেখতে পাই যে, কুরআন বর্ণনা বিন্যাসে আয়াতগুলো পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত হলেও মাঝে মধ্যে ভিন্ন ও স্বাধীন অর্থবোধক কোনো কোনো আয়াত চলে আসে যেগুলোর অর্থ বিচারে সূরা বা অধ্যায়ের অংশ বলে মনে না হলেও সম্পূর্ণ অধ্যায় পাঠান্তে আয়াতগুলো যে সে অধ্যায় বা সূরার অবিচ্ছেদ্য অংশ তা সহজেই অনুমিত হয়। অর্থাৎ প্রতিটি আয়াতের একটি স্বাধীন অর্থ থাকলেও তা অধ্যায় বিন্যাসের অধীন থাকে। এ আয়াত বা আয়াতাংশের আংশিক অর্থ, সামষ্টিক সূরা অধ্যায়ের সার্বিক অর্থ হিসেবে পরিগণিত হয়


হাফিজের গজলের শ্লোকগুলোর পারস্পরিক গঠন প্রক্রিয়াও তেমনি। কখনো কখনো কবিতার শ্লোক বর্ণনার ধারাবাহিকতায় একটি শ্লোকের সাথে অপর ছত্রের বিষয়বস্তুগত বাহ্যিক কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে পূর্ণ গজল পাঠ করলেই চরণসমূহের অর্থগত অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের সেই মিল পরিষ্কার বোঝা যায়। অর্থাৎ প্রতিটি শ্লোকের একটি স্বাধীন অর্থ থাকলেও সামষ্টিকভাবে একটি গজলেরই অরিচ্ছেদ অংশ বলে প্রতীয়মান হয়। (সায়েদী: ১৩৬৯; ১৮৬-৮৭)


এ কারণেই হাফিজ দাবি করেছেন
হে হাফিজ! যদি সুস্থতা কামনা করো তবে প্রভাতে জেগে ওঠ
যা কিছুই করেছি তা সবই পবিত্র কুরআনের সম্পদের মাধ্যমেই করেছি।
কবিতায় পবিত্র কুরআনের আয়াত ও আয়াতাংশ সংযোগ: হাফিজ তার গজলে শব্দ চয়ন, বাক্য বিন্যাস মমার্থ বর্ণনা ও পরিভাষা ব্যবহারেও কুরআনশৈলি দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। পবিত্র কুরআনের শব্দ ও বাক্য বিন্যাস, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, প্রবাদ-প্রবচন, এর শৈল্পিক ও নান্দনিক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁর কাব্যসৌন্দর্য বাড়িয়েছেন। এতে যেমন বেড়েছে তার কাব্যশোভা, অর্থে এসেছে গভীরতা, কবিতা হয়েছে শ্রুতিমধুর, পাঠক মহলে এসেছে মুগ্ধতা। অবশ্য কুরআনের জ্ঞানে আলোকিত ব্যক্তিবর্গ ভিন্ন সাধারণের পক্ষে তাঁর কাব্যের এই রসবোধ আস্বাদন করা মোটেই সম্ভব নয়।
হাফিজ বলেন:
(কাছিদে : ২ গানজুর)


জগতের মাঝে এমন হাফেজ পাবে নাকো খুঁজে
আমার মত যে কুরআনের তত্ত্বে, দর্শন বুঝে। (শাহ নেওয়াজ: ০৩ জুন, ২০২০)
কুরআনের অলংকরণে সজ্জিত তাঁর গজলের কয়েকটি নমুনা নিম্নে তুলে ধরছি যাতে তিনি কুরআনের কোনো আয়াত বা আয়াতাংশ আত্মীকরণ করেছেন শৈল্পিকভাবে।
(গজল : ২১৬, গানজুর)
সামান্য বিরক্তিতে দ্রুতই করো না তিরস্কার আমায়
হাফিজ! শুরু করো তোমার বক্তব্য বিসমিল্লায়।
(গজল : ২২, গানজুর)
দুনিয়ার কুটকৌশল যত, শক্তিপূজা ও পরকালীন ভয়,
নত করেনি আমারে কভু, মুক্তিদাতা এ ফেতনায়
তাবারাকাল্লাহ আল্লাহ বরকতময়।
[গযল ২৫১, গানজুর]
কেটে গিয়েছে যন্ত্রণা যত, কদরের মহিমায়,
ফজরেও তা রইবে বহমান রজনী প্রশান্তিময়।
চিরন্তন হয়েছে আরাম আয়েশ মোর প্রিয়ার সান্নিধ্য কামনায়,
সার্থক হয়েছে সকল প্রত্যাশা মোর পড় আলহামদুলিল্লাহ।
(গজল ২৪৪, গানজুর)


উপস্থিতি তো সান্নিধ্যের নির্জনতা আর বন্ধুদের সমাগম,
‘ওয়া ইন ইয়াকাদু’ তেলাওয়াত কর এবং দরজা খুলে দাও।
কুরআনের আয়াতের ভাবার্থ প্রয়োগ: হাফিজ পবিত্র কুরআনের আয়াত বা আয়াতাংশের ভাবার্থ নিয়েও কবিতা রচনা করেছেন। যেমন: মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের সূরা আহযাবের ৭৩নং আয়াতে শরিয়তের বিধান সম্পর্কে বলেন: ‘আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো, কিন্তু মানুষ তা বহন করা। নিশ্চয় সে জালিম ও অজ্ঞ।’ (সূরা আহযাব ৩৩: আয়াত ৭৩)
হাফিজ বলেন:
(গজল : ১৮৪, গানজুর)


আসমান পারেনি বহন করতে এই আমানত ভার
অবশেষে আমি পাগলের নামে এলো ভাগ্যফল তার। (সেহাত : ২০১৮)
একইভাবে সূরা আহযাবের ৫৬নং আয়াতের ভাবার্থও তিনি এনেছেন তাঁর কবিতায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর সকল ফেরেশতা তাঁর নবির উপর দরুদ, সালাম (রহমত) প্রেরণ করেন। হে ইমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ সালাম পাঠ করো।’ এই আয়াতের ভাবার্থকে উপজীব্য করে হাফিজ বলেন :
(রুবায়ী-৩, গানজুর)
বললাম, হাফিজ, তোমার যা বলার ছিল সবই বলা হয়ে গেছে।
আনন্দ করে! মনোহারী কথা যারা বলেন তাদের প্রতি দরুদ সালাম।
একইভাবে সূরা আনআমের ১০৩নং আয়াতের ভাবার্থ: ‘দৃষ্টিসমূহ তাঁকে পেতে পারে না, অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে পেতে পারেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও সুবিজ্ঞ’ ধারণ করে হাফিজ বলেন :
(গজল ৩৯৪)
তোমার (কুদরতি) মুখ দেখতে, ঐ চোখ প্রয়োজন যা রুহানি জগৎ দেখতে পায়,
আমার এ চোখ দুনিয়া দেখে যে, তোমায় দেখায় যোগ্য নয়।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কাহিনীকেও তিনি তুলে এনেছেন তাঁর কবিতায়। হারিয়ে যাওয়া হযরত ইউসুফ (আ.) পুনরায় কেনানে ফিরে আসার গল্প বর্ণনা করে হতাশার দোলাচল থেকে মুক্তি কামনা করে তিনি বলেন:


(গজল ২৫৫, গানজুর)
দুঃখ করোনা হারানো য়ুসুফ
কানানে আবার আসিবে ফিরে।
দলিত শুষ্ক এমরু পুন
হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে। (নজরুল)
তাই বলা যায়, হাফিজের দিভানে অগণিত গজল ও অন্যান্য কবিতা রয়েছে যার ছত্রসমূহ পবিত্র কুরআনের আয়াত, আয়াতাংশ, ভাবধারা প্রয়োগে সমৃদ্ধ করেছেন। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর জীবনের চল্লিশটি বসন্তকাল এ মহাগ্রন্থের অনুশীলন ও প্রশিক্ষণে কাটিয়েছিলেন বলে। দীর্ঘদিনের সেই লব্ধ অভিজ্ঞতার স্বার্থক প্রয়োগ করেছেন তাঁর কাব্যে। এতে তাঁর কবিতা হয়েছে আরো অর্থবহ, বেড়েছে আংগিক শোভা, ছন্দের মাত্রায় যোগ হয়েছে অভিনব রসবোধ। তাই তাঁর কাব্যের আবেদন এখনো চিরন্তন। ‘লিসানুল গায়েব’ খ্যাত হাফিজ যথার্থই বলেন:
হাফিজের হৃদয় উতালা হয়েছে, সর্বগ্রাসী থাবায়,
চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটেছে কুরআন ও আল্লাহর ভাবনায়।
লেখক: অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here