হাফিজের কাব্যে পবিত্র কুরআনের প্রতিফলন

0
20


অধ্যাপক ড. মো. মুহসীন উদ্দীন মিয়া
পবিত্র কুরআন সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহর বাণী। এর ভাষা ও বক্তব্য শাশ্বত, চিরন্তন। এটি মহানবি হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নবুওয়াতি জীবনের সবচাইতে বড় মুজিযা। ইসলাম তথা আসমানি জীবন ব্যবস্থার প্রজ্ঞাময় অবিকৃত সর্বশেষ গ্রন্থও এটি। এর সাহিত্যশৈলি ও মুজিযার কথা সর্বজনবিদিত।


কুরআনে বর্ণনার বিভিন্ন ঢং, হেকমত, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারাসহ অতি উঁচু মানের সাহিত্যালংকারের সমাবেশ ঘটেছে। এর অভ্রভেদী বাণী অনিন্দ্য সুন্দর ও বাক্সময় বর্ণনাশৈলীর কাছে মাথানত করেছেন বড় বড় কবি ও সাহিত্যিক। ‘আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে?’ [২/১৩৮, অনুবাদ মারেফুল কুরআন] আল কুরআনের এই অমোঘ বাণীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে মহান আল্লাহর রহমত ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে মুসলিম বিশ্বের অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্যকর্মে কুরআনশৈলী গ্রহণ করেছেন।


ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকও কুরআনের অলংকরণ অনুসরণ করে তাঁদের সাহিত্যকর্ম সাজিয়েছেন। এ ভাষার যে সকল সাহিত্যিক পবিত্র কুরআনকে মন ও মননে ধারণ করে নিজ অভিব্যক্তি বর্ণনায় এর শৈলীবিদ্যার সংযোগ ও সংমিশ্রণে সফল হয়েছেন তাঁদের পুরোধা পুরুষ হিসেবে হাফিজের নাম সবিশেষে উল্লেখযোগ্য।


পরিচিতি: তাঁর প্রকৃত নাম খাজা শামসুদ্দিন মোহাম্মদ বিন বাহাউদ্দিন সুলগারি মোহাম্মাদ হাফিজ শিরাজী। জন্মের সময় তাঁর চেহারা সূর্যের ন্যায় উদ্ভাসিত ছিল বলে বাবা-মা তাঁর নাম রাখেন শামসুদ্দিন বা দ্বিনের সূর্য। শিরাজ নগরে জন্ম নেন বিধায় শিরাজী। শৈশবে পবিত্র কুরআন হেফজ বা মুখস্ত করেছিলেন বলে তিনি হাফিজ নামে সর্বাধিক পরিচিতি পান।


তাঁর জন্মসাল জানা যায়নি। তবে গবেষকগণের ধারণা মতে তিনি অষ্টম হিজরি মোতাবেক খ্রিষ্টিয় চর্তুদশ শতাব্দীতে (১৩১০ থেকে ১৩৩০ সালের ভিতর) ইরানের শিরাজ নগরীর রুকনাবাদের মোসাল্লা নামক স্থানের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট গবেষক এ. জে. আর বারীসহ অনেক গবেষক তাঁর জন্মসাল ১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দ বলে উল্লেখ করেছেন। [শাহনেওয়াজ, ইনকিলাব, ২৬ জুন ২০২০]


হাফিজের মৃত্যুসন নিয়েও মতভেদ বিদ্যমান। ‘শারহে গাযালহায়ে হাফেজ’ প্রণেতা হোসাইন আলি হারুভি তাঁর মৃত্যুসাল ৭৯২ হিজরি মোতাবেক ১৩৯০ সাল এবং বয়স ৭২ বছর ছিল বলে উল্লেখ করেছেন [হারুভি: ১৩৯২ : ১৮] দৌলত শাহের মতে তিনি ৭৯৪ হিজরি মোতাবেক ১৩৯১ সাল এবং হাফিজের বন্ধু ও তাঁর কবিতার সর্বপ্রথম সংগ্রাহক ‘গুল আন্দাম’ বলেন, তাঁর মৃত্যুসাল ছিল ৭৯১ হিজরি মোতাবেক ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ।


আবার গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের (রাজত্বকাল ১৩৮৯-১৪০৯ খ্রি.) সাথে হাফিজের পত্র বিনিময় হয়েছিল। এর থেকে অনুমিত হয় হাফিজ অন্তত ১৩৯০ সাল পর্যন্ত বেচেছিলেন। তাই দৌলত শাহের মতামতই তাঁর মৃত্যুসালের যথার্থ কাছাকাছি মতামত বলে বলে বিবেচিত হয়। [বরকত উল্লাহ : ২০১০ : ২৩৬]


পিতা বাহাউদ্দিন সুলগারির কাছেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। বাবার মুখে পবিত্র কুরআনের বাণী শুনেই তিনি কুরআনের প্রতি অনুরক্ত হন। কিন্তু পিতৃবিয়োগ ঘটলে এ সময়ে তাঁর জীবনের ছন্দপতন ঘটে। সংসারের সকল দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়লেও বিদ্যার্জনে তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ‘মেইযানে’ গ্রন্থ প্রণেতা আবদুন্নবির বর্ণনা মতে তখন তিনি একটি রুটির দোকানে কাজ নেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিকটস্থ বিদ্যালয়ের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন কাওয়ামুদ্দিন আবদুল্লাহর (মৃত্যু ৭৭২ হি.) কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের সাথে সাথে পবিত্র কুরআন মুখস্ত করতে শুরু করেন। তাঁর কাছে থেকেই হাফিজ ইলমে কালাম, ইলমে তাফসির, ইলমে কিরআত ও দর্শনশাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেন।


এছাড়াও তিনি যুগের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ শামসুদ্দিন আবদুল্লাহ শিরাজী, কাজী এযদুদ্দিন আবদুর রহমানসহ নাম না-জানা আরো অনেকের কাছে তাফসির, হাদিস, কালামশাস্ত্র, আরবি ও ফারসি সাহিত্য এবং ধর্মতত্ত্বে অসাধারণ পান্ডিত্য অর্জনে সমর্থ হন। (তারিক, ২০১৮ পৃ.) পবিত্র কুরআন বিশ্লেষণ বিদ্যায় তিনি তখন এতটাই পারদর্শী হয়ে ওঠেন যে, আল্লামা জামখসারি প্রণীত ‘তাফসিরে কাশশাফ’ গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাশিয়া গ্রন্থও লিখেছিলেন। একই সাথে ইলমে কিরআত তথা পবিত্র কুরআনের পঠন রীতির ভিন্ন ভিন্ন চৌদ্দটি পদ্ধতি করায়ত্ব করতে সমর্থ হন। (হুমায়ী : ১৩৭৩ : ১১৩)


এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
তোমার প্রেম চিৎকার দিয়ে উঠবে যদি হাফিযের মতো
কুরআন মুখস্ত পড় চৌদ্দ প্রকার রেওয়ায়েত সহকারে।
(সেহাত, অক্টোবর-নভেম্বর : ২০১৮)


তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও অসামান্য কৃতিত্বের কারণে স্বদেশবাসীরা তাঁকে অসংখ্য উপাধিতে বিভূষিত করেন। যেমন: ‘লিসানুল গায়েব’ বা অজ্ঞাতের বাণী এবং ‘তরজুমানুল আসরার’ বা রহস্যের মর্মসন্ধানী ছিল তাঁর প্রসিদ্ধ উপাধি। এছাড়াও ‘মুলুকুল ফুজালা’, ‘কাশেফুল হাকায়েক’, ‘মাযদুবে সালেক’, ‘বুলবুলে শিরাজ’, ‘খাজা হাফিজ’, ‘ফাখরুল মুতাকাল্লেমিন’ তাঁর উল্লেখযোগ্য উপাধি ছিল।
সাহিত্য সাধনা: হাফিজ যৌবনে প্রায় ২১ বছর বয়সেই কাব্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। মরমি ধারার সাহিত্য রচনায় তখন তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। অতি অল্প সময়ে তাঁর দর্শন ও কাব্যখ্যাতি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বহিঃবিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ে মুযাফফারীয় রাজবংশের আবু ইসহাক ইনযু, আমির মুবারেযুদ্দিন মুহাম্মদ এবং তাঁর পুত্র শাহশুজা ও শাহ মনসুরের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাঁর সাহিত্যকর্মে গতির সঞ্চার হয়। হাফিজ তাঁর কোন কোন গজলে এই বাদশাদের প্রশংসা করেছেন।


‘দিভান’ বা কাব্য সমগ্র হলো তাঁর অন্যতম সাহিত্য নিদর্শন। এতে রয়েছে প্রেম ও মরমি ভাবধারা সম্বলিত অসংখ্য (৪৯৫) গজল। সমসাময়িক বাদশাগণের প্রশংসায় রচিত কয়েকটি কাসিদা। কিছু রুবায়ী ও দুটি মাসনাভী, যার একটি ‘সাকীনামে’ খ্যাত; অপরটি হলো প্রেম বিষয়ক। [হোমায়ী : ১৩৭৩ : ১১৩]


কুরআনের প্রতিফলন: বহুমুখি জ্ঞানের অতুলনীয় রত্মভান্ডার হিসেবে বিবেচিত হাফিজ-কাব্যে ফুটে উঠেছে বিশ্বপ্রকৃতি ও মানব জীবনের গভীর রহস্য। শেখ সাদির পরে হাফিজকেই শ্রেষ্ঠ ফারসি গজল বা গীতিকাব্য রচয়িতা বলে ভাবা হয়। প্রগাঢ় প্রেম ও গভীর আধ্যাত্মিকতায় সিক্ত তাঁর কবিতায় মুগ্ধ হয়েছেন বিশ্ববাসী। শরাব-সাকী, প্রেম-মদিরা, বসন্ত গোলাপ, প্রেমাস্পদের রূপমুগ্ধতা তাঁর মরমি সাধনার রূপক বর্ণনা হিসেবে ধরা দিয়েছে তাঁর কবিতায়। আত্তার ও রুমির অধ্যাত্মবাদ, সাদির মানবতাবোধ, সানায়ীর আত্মসমালোচনা ও সামাজিক মূল্যবোধের নির্যাসকে ধারণ করে আছে হাফিজের গজল।


হাফিজ-গবেষকগণের ভাষ্যমতে তিনি তাঁর জীবনের প্রায় চল্লিশ বছর কাটিয়েছেন মহাগ্রন্থ আল কুরআনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে। হাফিজ বলেন:
দীর্ঘ চল্লিশ বছরের সাধনায় আমার অন্তরে যে জ্ঞানবৈশিষ্ট্য সঞ্চিত হয়েছে,
ভয় হয়, না জানি প্রেয়সীর চোখের চাহনি তা হরণ করে নিয়ে যায়। (তারিক)
পবিত্র কুরআনে তাঁর এই অগাধ পান্ডিত্বের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কাব্যের প্রতিটি ছত্রে। কুরআনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণেই তিনি ‘খাজা হাফিজ’ অভিধায় বিভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর কাব্যসৌধের প্রতিটি ছত্রেই ঝংকৃত হয়েছে পবিত্র কুরআনের প্রতিধ্বনি। কবি বলেন:
(গজল ১৭৮ গানজুর)
হে হাফিজ! তোমার বক্ষে সংরক্ষিত কুরআনের আভায় রচিত
কবিতার চাইতে সুন্দর বাণী আর কিছু দেখিনি।


কুরআন সাধনার মাধ্যম হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন প্রেমকে। তাঁর মতে প্রেম একটি ঐশী ও এরফানি চেতনা, যা মানুষকে তার প্রেমাস্পদ মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে উদ্বুদ্ধ করে, অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেয়, সৃষ্টি রহস্যের নিগুঢ় তত্ত্ব অনুধাবনে সহায়তা করে। হৃদয়মন তখন মহাপ্রভুর রং-এ রঞ্জিত হতে ব্যাকুল হয়। এই ব্যাকুল মন নিয়েই হাফিজ তাঁর কাব্যের অবকাঠামো নির্মাণ, সৌন্দর্যবর্ধক আলংকারিক দিকনির্দেশনা গ্রহণ এবং কবিতার ভাব-রস, তাল-লয় নির্ধারণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মহাগ্রন্থ আল কুরআনের দ্বারস্থ হয়েছেন। কুরআনের সৌন্দর্য সুষমায় তিনি তাঁর কবিতার ক্যানভাস সাজিয়েছেন নিপুণ শিল্পীর মতো।
চলবে
[লেখক: অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here