১৮ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?

0
168

তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের

এক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ ১৮ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু ১৫টি অর্থবছরে এসব কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয়ের মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে এসেছে। অর্থাৎ বারবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও সামান্য পরিমাণ টাকাই সাদা করেছেন কালো টাকার মালিকরা। এর মধ্যে আবার ৯ হাজার কোটি টাকাই সাদা করা হয়েছে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। গণতান্ত্রিক শাসনামলে সাদা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা। তাহলে এই যে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা, সেগুলো যাচ্ছে কোথায়?

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা অনেকটা ঢালাওভাবে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মূলত করোনার অভিঘাতে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে অর্থ সংকট নিরসনেই এই ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর সুফল কতটা মিলবে তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্লেষকরা।

অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ এবং ২০০৮ সাল ছাড়া ‘কালো টাকা সাদা করার’ সুযোগ দিয়ে তেমন সুফল মেলেনি। তারপরও বারবার এই সুযোগ দেওয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

১০ শতাংশ কর দিয়ে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা, দালান নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে অপ্রদর্শিত আয়ের অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ গত অর্থবছরেই ছিল। ২০২০-২১ সালের বাজেটে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

কোনো জরিমানা ছাড়া কেবল ১০ শতাংশ কর দিয়ে যে কেউ তার অবৈধভাবে অর্জিত অথবা কর ফাঁকি দিয়ে গোপনে সঞ্চিত অর্থ এসব খাতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বা সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ ওই টাকার উৎস জানতে চাইবে না।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, “অবৈধ টাকার মালিকদের জন্য এটি একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’। আগে কখনও এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। ঘুষ-দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি করে বালিশের নিচে যারা টাকা রেখে দেন, তারাও ওই টাকা বৈধ করতে পারবেন।”

এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় সব সরকারই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে ১৫ অর্থবছরে এ সুযোগ দিয়ে সব মিলিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা ‘সাদা’ হয়েছে। আর তা থেকে সরকার কর পেয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা মত।

সবচেয়ে বেশি অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগে এসেছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, যখন দেশের পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। ওই দুই বছরে ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ সুযোগ নিয়েছিল; বৈধ হয়েছিল ৯ হাজার কোটি টাকা। তা থেকে সরকার কর পেয়েছিল এক হাজার ২০০ কোটি টাকার কিছু বেশি।

এই হিসাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগে যে পরিমাণ অপ্রদর্শিত আয় বৈধ হয়েছে, তার ৬৪ দশমিক ২৪ শতাংশই হয়েছে ওই দুই বছরে। এ পর্যন্ত পাওয়া মোট করের ৮০ শতাংশও ওই দুই বছরে এসেছে।

বাংলাদেশে অবৈধ আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে মাদক চোরাকারবার, অবৈধ বাণিজ্য, ঘুষ ও দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেছিল বিশ্ব ব্যাংক। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘কালো টাকা’ একটি ‘ওপেন সিক্রেটে’ পরিণত হয়েছে। ছোট চাকরি করলেও অনেকে বিলাসী জীবনযাপন করেন; ছেলে-মেয়েদের ব্যয়বহুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ান, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন, দামি গাড়ি চালান। ঘুষ-দুর্নীতিসহ অবৈধভাবে উপার্জন করা অর্থসম্পদ নামে-বেনামে নানা পন্থায় লুকিয়ে রাখেন তারা।

সেই টাকা অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার ‘সাদা’ করার সুযোগ দেয়। কখনো ঢালাও সুযোগ, কখনো শর্ত সাপেক্ষে সুযোগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে কত টাকা ‘অপ্রদর্শিত’, অর্থাৎ আয়কর বিবরণীর ঘোষিত আয়ের বাইরে রয়ে গেছে- তা নিয়ে সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা নেই৷ বিশ্ব ব্যাংক ২০০৫ সালের এক গবেষণায় বলেছিল, ২০০২-২০০৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় কালো টাকা নিয়ে একটি জরিপ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ২০১০ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৬২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

দেশে বর্তমানে জিডিপির আকার প্রায় ২৮ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে দেশে কালো টাকার পরিমাণ ১৮ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। পনের বছরে এর মধ্যে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে এসেছে। তাহলে বাকি ১৮ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়? বারবার সুযোগ দেওয়ার পরও এই অর্থ বিনিয়োগে আসছে না কেন? বিশ্লেষকদের ধারণা, এর অধিকাংশই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে স্থায়ী সম্পদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগ হয়েছে। যে কারণে বারবার সুযোগ দেওয়ার পরও কালো টাকা দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না।

বিষয়টি প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকারও করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের টাকা অবৈধভাবে যারা বিদেশে বিনিয়োগ করছেন, তাদের ধরতে বিদ্যমান আইনগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি ঠিক করা দরকার। আমরা চাই আমাদের দেশের অর্থ বিদেশে না যাক। এদেশের অর্থ এখানে অর্জন করে এখানে খরচ করতে হবে। আর যারা খরচ করতে চান না, এখান থেকে তারা একবারেই চলে যাক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here